তনু হত্যাকাণ্ডে ডিএনএ বিশ্লেষণে ৫ জনের উপস্থিতির প্রমাণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৬ বার
তনু হত্যাকাণ্ডে ডিএনএ বিশ্লেষণে ৫ জনের উপস্থিতির প্রমাণ
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দীর্ঘসূত্রিতার এক অন্যতম প্রতীক হয়ে রয়েছে বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলা। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের অন্ধকার এক গলি থেকে তনুর নিথর দেহ উদ্ধারের পর কেটে গেছে দীর্ঘ একটি দশক। দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও বিচার পাওয়ার আকুতি নিয়ে আজও বেঁচে আছেন তনুর হতভাগ্য বাবা-মা। তবে দীর্ঘ এই হতাশার পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে তনু হত্যা মামলায় এক যুগান্তকারী ও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ডিএনএ বিশ্লেষণের কল্যাণে এই হত্যা মামলার জটিল জট খুলতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক ডিএনএ টেস্টের ফরেনসিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে মোট পাঁচজন পুরুষের শুক্রাণু এবং একজনের রক্তের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এই নতুন প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই মামলার তদন্ত এখন নতুন গতিতে এগিয়ে চলেছে।
মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, তনুকে নৃশংসভাবে হত্যার আগে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল এবং এই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। তদন্তের পরিধি বাড়াতে আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। এ পর্যন্ত চারজন সাবেক সেনাসদস্য এবং একজন বেসামরিক ব্যক্তির ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৭ জুলাই আদালত নতুন করে আরও দুই ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কড়া নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের আওতায় আসা দুই ব্যক্তি হলেন তনুর পরিচিত ও বন্ধু কুমিল্লার রাজাপাড়ার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ রাব্বি এবং সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের বাসিন্দা সাবেক সেনাসদস্য জাহিদুল ইসলাম। তবে তদন্তের স্বার্থে মামলার ষষ্ঠ সন্দেহভাজনের নাম বা পরিচয় এখনো কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে রক্ষা করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
ডিএনএ রিপোর্টের জোরালো সূত্র ধরে ইতোমধ্যে আইনগত পদক্ষেপও শুরু হয়েছে। পিবিআইয়ের একটি চৌকস দল গত এপ্রিল মাসে মামলার অন্যতম সন্দেহভাজন হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, হাফিজুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মামলার অপর দুই সন্দেহভাজন সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান জাহিদ এবং সাবেক সেনাসদস্য শাহীন আলম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশ ছেড়ে গোপনে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। তদন্তে উঠে এসেছে যে, অভিযুক্ত শাহীন আলম গত এপ্রিল মাসেই অত্যন্ত সুকৌশলে কুয়েতে পালিয়ে গেছেন। তার ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত তার শেষ লোকেশন শনাক্ত করা হয়েছে। পলাতক এই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং ইন্টারপোলের সহায়তায় রেড নোটিস জারির প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে দীর্ঘ দশ বছরের বুকফাটা কান্না ও বিচার পাওয়ার অন্তহীন আকুতি। তিনি অভিযোগ করেন যে, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পুরো বিষয়টি নানাভাবে ধামাচাপা দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যে চিকিৎসকরা সম্পূর্ণ ভুল বা ভুয়া তথ্য দিয়ে ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের দৃশ্যবাচক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তনুর প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রদানকারী চিকিৎসক ডা. কামদা প্রসাদ সাহা বর্তমানে খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন, যা এক হতভাগ্য পিতার জন্য সহ্য করা অসম্ভব। ইয়ার হোসেনের জোরালো দাবি, সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে রিমান্ডে নিয়ে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেই হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য এবং মূল অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। কারণ ঘটনার দিন তনু সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করাতে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই ফেরার পথেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
অন্যদিকে, তনুর মা আনোয়ারা বেগমের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বর্ণনা করার মতো নয়। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন যে, তিনি এখন একজন জিন্দা লাশ ছাড়া আর কিছুই নন। বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতা নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত হাসপাতালে যাতায়াত করছেন এবং প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার মেয়ে সোহাগী জাহান তনুর নৃশংস হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় দেখে যাওয়ার শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে বর্তমানে পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে মামলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তদন্তের বর্তমান পর্যায়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হাতে এসেছে এবং আসামিরা দেশত্যাগ করলেও তাদের আইনের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা মেনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও গোপনীয়তা বজায় রেখে মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করার কাজ এগিয়ে চলছে।
উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালের কুষ্টিয়া বা কুমিল্লার সেই রক্তিম সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই সারা দেশের ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ ফুঁসে উঠেছিল। কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী তনু হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা বাংলাদেশ। কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরেও প্রকৃত অপরাধীরা ধরা না পড়ায় বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার বড় রকমের সংকট তৈরি হয়েছিল। সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থা এর আগে তদন্ত করলেও তা কোনো সুনির্দিষ্ট উপসংহারে পৌঁছাতে পারেনি। ২০১৭ সালে সিআইডি তনুর পোশাকের নমুনা পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা জানিয়েছিল, কিন্তু বর্তমান ডিএনএ বিশ্লেষণে সেই সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে পৌঁছানো এবং নতুন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়ার ঘটনা মামলার মোড় সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে।
আজকের এই অগ্রগতি কেবল একটি মামলার তদন্তের অগ্রগতি নয়, এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এক বড় পরীক্ষা। একটি স্বাধীন দেশে একজন তরুণী শিক্ষার্থীকে এভাবে ক্যাম্পাসের ভেতরে বা তার কাছাকাছি এলাকায় হত্যা করা হবে এবং দীর্ঘ এক দশকেও তার বিচার হবে না, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তনুর পরিবারের এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে হবে। পলাতক আসামিদের বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে এবং ডিএনএ রিপোর্টে যাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জাতি আজ তাকিয়ে আছে আদালতের দিকে, কবে এই দীর্ঘ ছায়ার অবসান ঘটে এবং তনুর আত্মা শান্তি পায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত