প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত অঙ্গনে চলমান উত্তেজনার পারদ আরও একবার উর্ধ্বমুখী হয়েছে। সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী নাজরান প্রদেশে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের চালানো অতর্কিত ও নির্বিচারে এক হামলায় চার বছর বয়সী এক শিশুসহ মোট ১১ জন বেসামরিক নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন। এই বর্বরোচিত হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধপদ্ধতির চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনপ্রতিষ্ঠা এবং বৈধতা রক্ষায় লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং এর পেছনের ভয়াবহ মানবিক পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের সংবেদনশীল দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশে আচমকা এই হামলা চালানো হয়। হুতি বিদ্রোহীদের নিক্ষিপ্ত বিস্ফোরক বা গোলার আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে ওঠে জনবহুল এলাকাটি। এই আকস্মিক হামলায় যে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে চার বছর বয়সি একটি নিষ্পাপ শিশুও রয়েছে। শিশুটির শরীর মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। নাজরান হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তাকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। এই ঘটনায় কেবল স্থানীয় নাগরিকরাই নন, বরং কর্মসংস্থানের জন্য দেশটিতে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরাও মর্মান্তিকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে সাতজন সৌদি নাগরিকের পাশাপাশি একজন ইয়েমেনি, দুইজন মিশরীয় এবং একজন পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছেন। আন্তর্জাতিক ভূখণ্ডে সাধারণ কর্মজীবী ও নিরীহ মানুষের ওপর এ ধরনের নৃশংস হামলা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি শুক্রবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই বর্বরোচিত হামলার কথা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে সুপরিকল্পিতভাবে বেসামরিক লোকালয়কে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তাদের নিক্ষিপ্ত গোলা সরাসরি সাধারণ মানুষের বসতি ও কর্মস্থলে আঘাত হানছে। মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি আরও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন যে, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং তাদের মদদদাতা ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারা আগামীতে আরও বড় ধরনের সমন্বিত হামলা চালানোর গোপন পরিকল্পনা করছে। এই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধানের জন্য সামরিক জোট সব ধরনের কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ ও তা অব্যাহত রাখতে পিছপা হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার পেছনে কেবল আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারই নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ জড়িত রয়েছে। ঠিক একই দিনে ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মারিব ও হাদরামৌত প্রদেশের সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলা চালায় হুতি বিদ্রোহীরা। ওই অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে সরকারি বাহিনীর ৩০ জনেরও বেশি সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, যা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য একটি মারাত্মক বিপর্যয়। অন্যদিকে, গত ২৯ জুলাই সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত উগ্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাথে যৌথভাবে অত্যন্ত সফল একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই যৌথ সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই হুতি বিদ্রোহীরা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এই কাপুরুষোচিত ও প্রতিহিংসামূলক হামলা চালিয়েছে।

এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনের সমস্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আবারও বড় ধরনের ধাক্কা খেল। ইয়েমেনে শান্তি ফেরানোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো বারবার ব্যর্থ হচ্ছে মূলত বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে বাইরের রাষ্ট্রগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক মদদ জোগানোর কারণে। নাজরান প্রদেশের এই হামলায় একটি নিষ্পাপ শিশুর ঝলসে যাওয়া দেহ এবং সাধারণ প্রবাসীদের আহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের বলি সবসময়ই হয় সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন শান্তির বদলে বারুদের গন্ধ আরও তীব্র হচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ ও কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।