প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আকর্ষক এবং বর্ণিল দলবদলের বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় চমকটি উপহার দিয়েছেন মোহাম্মদ সালাহ। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ঐতিহাসিক ক্লাব লিভারপুলের সাথে দীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়ের ইতি টেনে এই মিশরীয় ফরোয়ার্ড নতুন ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তুরস্কের সুপার লিগের ক্লাব ত্রাবজোনস্পোরকে। ইউরোপীয় ফুটবলের এই অদ্ভুত ও অভাবনীয় পটপরিবর্তন বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে এক বিশাল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে লিভারপুল হলো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় পরাশক্তি, যারা কেবল গত মৌসুমেও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করেছে। অন্যদিকে ত্রাবজোনস্পোর তুরস্কের ফুটবলে প্রথম সারির কোনো ক্লাব তো নয়ই, বরং দেশের মূলধারার সমর্থক গোষ্ঠীর প্রায় নব্বই শতাংশেরই সমর্থন মূলত গালাতাসারাই, ফেনেরবাচে বা বেসিকতাসের মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর দিকে। এমন একটি দল, যারা সরাসরি ইউরোপা লিগের মূলপর্বেও খেলার ছাড়পত্র পায়নি এবং যাদের ইউরোপীয় র্যাঙ্কিংয়ের অবস্থান যথেষ্ট পেছনে, সেই ক্লাবে একজন বিশ্বমানের তারকার যোগদানের পেছনের কারণগুলো নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
৩৪ বছর বয়সি একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত সাহসি ও কৌতূহলউদ্দীপক। সাধারণত এই বয়সে পৌঁছানোর পর ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় লিগ বা ক্লাবগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু থেকে ফুটবলাররা ধীরে ধীরে দূরে সরে যান। অনেকে আবার ক্যারিয়ারের শেষবেলায় বিশাল অঙ্কের আর্থিক প্রাপ্তির আশায় পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবলে। কিন্তু মোহাম্মদ সালাহর ক্ষেত্রে ঘটনাটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে যিনি লিভারপুলের সাথে নতুন করে দুই বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করেছিলেন, তার পক্ষে মাত্র এক বছর পরেই অ্যানফিল্ডের মায়া ত্যাগ করা এবং উয়েফা কো-ইফিশিয়েন্ট র্যাঙ্কিং অনুসারে তুলনামূলক কম খ্যাতনামা লিগে নাম লেখানো সহজ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। তা সত্ত্বেও কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা লিগ ছেড়ে তুরস্কের এই চতুর্থ জনপ্রিয় ক্লাবে পা রাখলেন, তার গভীরে তাকানো হলে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত ও সুচিন্তিত কৌশলগত কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, যা আধুনিক ফুটবল ব্যবসার এক নতুন রূপরেখা তুলে ধরে।

প্রথমত, সৌদি আরবের ক্লাবগুলোর লোভনীয় ও বিশাল অঙ্কের আর্থিক প্রস্তাব সত্ত্বেও সালাহ ইউরোপীয় প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলেই নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চেয়েছেন। এর আগে ২০২৩ সালেই আল ইত্তিহাদ তাঁকে দলে ভেড়ানোর জন্য প্রায় ১৫ কোটি পাউন্ডের অবিশ্বাস্য প্রস্তাব দিয়েছিল, যা সেসময় বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু অর্থের মোহে ইউরোপের মূলধারার ফুটবল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে রাজি হননি ‘ইজিপশিয়ান কিং’। দ্বিতীয়ত, ৩৪ বছর বয়সে এসে স্পানিশ লা লিগা কিংবা ইতালিয়ান সিরি আ-এর কোনো ক্লাবে গেলে তাকে হয়তো বেতনে বড় ধরনের আর্থিক অবনমন বা সমঝোতা করতে হতো। কিন্তু ত্রাবজোনস্পোরের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে তাকে পারিশ্রমিকের দিক থেকে এক বিন্দুও ছাড় দিতে হয়নি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যম ইএসপিএনের তথ্য অনুযায়ী, তুর্কি এই ক্লাবটির সাথে দুই বছরের চুক্তিতে তিনি মৌসুমপ্রতি প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ ইউরো সম্মানী হিসেবে অর্জন করবেন। এছাড়া ত্রাবজোনস্পোর একটি স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্ত ক্লাব হওয়ায় সালাহর নামে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ধরনের অফিশিয়াল পণ্যের লভ্যাংশের কুড়ি শতাংশ সরাসরি তার পকেটে যাবে, সাথে থাকছে আকর্ষণীয় সব পারফরম্যান্সভিত্তিক বোনাস।
খেলোয়াড়দের দলবদলের নেপথ্যে মাঠের ভেতরের হিসেব-নিকেশের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ত্রাবজোনে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্তেও এই মানবিক ও ব্যক্তিগত দিকগুলো গভীরভাবে কাজ করেছে। কৃষ্ণসাগর উপকূলের চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত এই শহরটিতে পরিবার নিয়ে ইউরোপীয় জীবনযাত্রার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করার পাশাপাশি নিজের জন্মভূমি মিসরের সাথে দূরত্বের ব্যবধানও অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তুরস্ক থেকে মাত্র দুই ঘণ্টার বিমানযাত্রায় মিসরে পৌঁছানো যায়, যা তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক যোগাযোগের পথকে অত্যন্ত সুগম করেছে। তাছাড়া তুরস্কের প্রচলিত করব্যবস্থা ইউরোপের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ফুটবল খেলুড়ে দেশের তুলনায় বিদেশি তারকা খেলোয়াড়দের জন্য অনেক বেশি করবান্ধব ও সুবিধাজনক। এই সমস্ত নানামুখী সুযোগ-সুবিধা তার এই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তে দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছে বলে ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে এই চুক্তির পেছনে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং আবেগঘন দিকটি হলো সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক ফর্মুলা। লিভারপুলের হয়ে নয় বছরে দুই শতাধিক গোল করা, প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো প্রায় সবকটি মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা জেতা সালাহ অ্যানফিল্ড ছেড়েছেন একজন অবিসংবাদিত কিংবদন্তি হিসেবে। ত্রাবজোনে তিনি এমন এক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন যেখানে ক্লাবটি অতীতে সাতবার লিগ শিরোপা জিতলেও গত বিরাশি বছরের মধ্যে কেবল একবারই চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছে। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা ছেড়ে আশির দশকের মাঝামা সময়ে তৎকালীন তুলনামূলক স্বল্প আলোচিত ইতালির নাপোলিতে পা রেখেছিলেন ম্যারাডোনা এবং সেই ক্লাবটিকে বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় পৌঁছে দিয়ে অমরত্ব লাভ করেছিলেন। সালাহর সামনেও ঠিক তেমনি ত্রাবজোনস্পোরকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এবং ক্লাবটির ইতিহাসে অনন্য এক মহাকাব্য রচনার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। যদি তিনি এই দলকে পুনরায় তুর্কি লিগের মুকুট এনে দিতে পারেন এবং ইউরোপীয় অঙ্গনে সাফল্য এনে দিতে পারেন, তবে নাপোলির মতো ত্রাবজোনের ইতিহাসের সাথেও তার নাম চিরকালের জন্য স্বর্ণাক্ষরে খোদাই হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে, মোহাম্মদ সালাহর ত্রাবজোনস্পোরে এই অপ্রত্যাশিত যোগদানকে কেবল একটি সাদামাটা দলবদল বা ছোট ক্লাবে ক্যারিয়ার শেষ করার করুণ পরিণতি হিসেবে দেখা পুরোপুরি ভুল হবে। এটি মূলত বৈশ্বিক ফুটবল বাণিজ্যের এক মাস্টারপ্লাস কৌশল, যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অদম্য জেদ, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখার সুব্যবস্থা, পরিবারের সান্নিধ্য পাওয়ার ব্যাকুলতা এবং ইতিহাসের পাতায় নতুন কোনো অমর কীর্তি গড়ার দুর্নিবার স্পৃহা। ত্রাবজোনস্পোর ক্লাবের জন্যও এই সাইনিং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচিতি এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু বহুগুণ বাড়িয়ে নেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সালাহর আগমনের পর থেকেই ক্লাবটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী ও ভক্তের সংখ্যা যেভাবে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে এই চুক্তি উভয় পক্ষের জন্যই এক দূরদর্শী ও লাভজনক পদক্ষেপ। আধুনিক ফুটবলের এই বহুমাত্রিক খেলায় সালাহর এই সিদ্ধান্ত আগামী দিনগুলোতে দলবদলের বাজারে নতুন ধারা তৈরি করবে বলেই বিশ্বাস ফুটবল বিশ্লেষকদের।