‘গুপ্ত আওয়ামী লীগ’ প্রশ্নে যা বললেন রুমিন ফারহানা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণ নিয়ে নিজের বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। কেউ কেউ তাঁর বক্তব্যকে আওয়ামী লীগের পক্ষে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে সরাসরি তাঁর কাছে প্রশ্ন রাখা হলো—তিনি কি ‘গুপ্ত আওয়ামী লীগ’?

সাংবাদিক ও উপস্থাপক খালেদ মুহিউদ্দীনের ‘ঠিকানা’ টকশোতে উঠে আসে এ প্রশ্ন। জবাবে রুমিন ফারহানা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি আওয়ামী লীগ করেন না। বরং কোনো ব্যক্তি বা দলের পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, অন্যায় হচ্ছে কি না সেটি বিবেচনা করেই প্রতিবাদ করার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।

আলোচনার একপর্যায়ে খালেদ মুহিউদ্দীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুমিনকে ঘিরে চলমান সমালোচনার প্রসঙ্গ সামনে আনেন। তিনি বলেন, গত এক বছরে রুমিন ফারহানার বক্তব্য পছন্দ করেছেন এমন মানুষেরও একটি অংশ এখন অভিযোগ করছেন যে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ টিকিয়ে রাখছেন।

এমনকি কেউ কেউ তাঁকে ‘গুপ্ত আওয়ামী লীগার’ হিসেবেও অভিহিত করছেন বলে প্রশ্নে উল্লেখ করেন খালেদ। এসব অভিযোগ রুমিন কীভাবে দেখছেন, সেটিও জানতে চান তিনি।

জবাবে কিছুটা রসিকতার আশ্রয় নেন রুমিন ফারহানা। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সত্য ধরে নিলে নিজেকে একটি ‘লাইফ সেভিং মেশিন’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রুমিনের ভাষ্য ছিল, বিএনপি যখন আইসিইউতে যায় তখন তিনি বিএনপিকে বাঁচান। আবার সমালোচকদের অভিযোগ অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সংকটে পড়লেও তিনি নাকি আওয়ামী লীগকে বাঁচাচ্ছেন। এমন বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া দুই বিপরীত রাজনৈতিক মূল্যায়নের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি।

খালেদ মুহিউদ্দীন তখন আরও সরাসরি জানতে চান, দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিএনপিকে রক্ষার চেষ্টা করা বোধগম্য। কিন্তু তিনি গোপনে আওয়ামী লীগ করেন কি না?

রুমিন ফারহানা এর জবাবে পরিষ্কারভাবে বলেন, তিনি আওয়ামী লীগ করেন না। এরপর নিজের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের দুর্বল অবস্থায় আঘাত করার বিষয়টি সামনে আনেন।

তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যখন সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে থাকে তখন তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই প্রকৃত সাহস। বিপরীতে প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ার পর সুযোগ নিয়ে তাকে আঘাত করাকে তিনি সাহসী আচরণ হিসেবে দেখেন না।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা সময়ের কথাও সামনে আনেন রুমিন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলটি যখন সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল তখনও তিনি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। ফলে এখন পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কথা বলাকে আওয়ামী লীগের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেই তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

এরপর খালেদ মুহিউদ্দীন জানতে চান, রুমিনের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য আওয়ামী লীগের পক্ষে যাচ্ছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে তার কারণ কি এই যে, তিনি যার প্রতি অন্যায় হচ্ছে তার পক্ষেই কথা বলছেন?

রুমিন এতে সম্মতি জানান। খুব সহজভাবে এটিই তাঁর অবস্থান বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আলোচনার পরবর্তী অংশে আরও জটিল একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অন্যায় ও নিপীড়নের অভিযোগ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই দলের নেতাকর্মীদের প্রতি কেন ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে—এমন প্রশ্ন সমাজের একটি অংশে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন খালেদ মুহিউদ্দীন।

জবাবে রুমিন প্রতিশোধের রাজনীতির বিপদ নিয়ে কথা বলেন। তাঁর মতে, ঘৃণার জবাবে ঘৃণা দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত সমাজে ঘৃণাই বিস্তার লাভ করবে।

নিজের বক্তব্য বোঝাতে তিনি বহুল প্রচলিত ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতির পরিণতি সম্পর্কিত একটি উদ্ধৃতির ভাবার্থ তুলে ধরেন। প্রতিশোধের ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করে—এমন দর্শনের ভিত্তিতে রাজনীতি করতে চান না বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

রুমিনের যুক্তি ছিল, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যেসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে বিএনপি এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রতিবাদ করেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একই ধরনের আচরণ করলে আগের প্রতিবাদের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা এবং বিরোধী নেতাদের হয়রানির প্রসঙ্গ সামনে আনেন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে অতীতে যে আচরণ করা হয়েছিল সেটিও আলোচনায় উল্লেখ করেন রুমিন।

একই সঙ্গে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করেন তিনি। রুমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অন্যায় হলে সেটির প্রতিবাদ করা এবং বর্তমানে অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষের বিরুদ্ধে একই ধরনের অন্যায় হলে নীরব থাকা পরস্পরবিরোধী অবস্থান।

তাঁর মতে, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় দেখে প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ন্যায় ও অন্যায়ের প্রশ্নে একই মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন।

এই জায়গাতেই ‘গুপ্ত আওয়ামী লীগ’ অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজের মূল ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন রুমিন ফারহানা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর প্রতি অন্যায় হলে তার প্রতিবাদ করার অর্থ দলটির রাজনীতি সমর্থন করা নয়। বরং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নিজের অবস্থানে ধারাবাহিক থাকার চেষ্টা করছেন তিনি।

রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। হাঁস প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট।

নির্বাচনের পরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে দলীয় রাজনীতির বাইরে ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক মামলা এবং ভিন্নমতের মানুষের অধিকার নিয়ে করা মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো প্রশংসা আবার কখনো তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

‘ঠিকানা’ টকশোর আলোচনাতেও সেই বিতর্কেরই প্রতিফলন দেখা গেছে। খালেদ মুহিউদ্দীন সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত অভিযোগ সামনে আনলে রুমিন নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পান।

তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ধারাবাহিক থাকা। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালে অন্যায় হলে যেমন প্রতিবাদ করেছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কারও প্রতি অন্যায় হলেও একইভাবে প্রতিবাদ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

তবে তাঁর এমন অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমতও রয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের পক্ষে যায় এমন বক্তব্য দলটির রাজনৈতিক ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করতে পারে। রুমিন সেই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে নিজের বক্তব্যকে ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরোধিতার জায়গা থেকে দেখছেন।

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণের প্রশ্নটি বারবার আলোচনায় এসেছে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিরোধীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন কিংবা ক্ষমতা হারানোর পর সাবেক ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা—উভয় অভিযোগই বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।

রুমিনের বক্তব্য সেই পুরোনো বিতর্কে নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—ন্যায়বিচারের মানদণ্ড কি রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে?

তাঁর উত্তর স্পষ্ট। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং কোনো ব্যক্তির সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে কি না সেটিই তাঁর কাছে বিবেচ্য হওয়া উচিত। ব্যক্তি দেখে প্রতিবাদ বেছে নিলে ন্যায়বিচারের দাবি দুর্বল হয়ে যায় বলেও মনে করেন তিনি।

ফলে ‘গুপ্ত আওয়ামী লীগ’ হওয়ার প্রশ্নে রুমিন ফারহানার জবাব শুধু নিজের দলীয় পরিচয় অস্বীকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, ন্যায়বিচার এবং প্রতিপক্ষের অধিকার নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা কিংবা সমালোচনা চললেও রুমিনের দাবি পরিষ্কার—তিনি আওয়ামী লীগ করেন না। বরং যে পক্ষের প্রতিই অন্যায় হোক না কেন, সেটির বিরুদ্ধে কথা বলার নীতিতেই থাকতে চান তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত