প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিজয় একাত্তর হলে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহফুজকে ছয় মাসের জন্য হল থেকে বহিষ্কার করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে হলে তাঁর বরাদ্দ করা আবাসিক আসনও বাতিল করা হয়েছে।
বিজয় একাত্তর হল প্রাধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে জারি করা এক নোটিশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে শাস্তি কার্যকর হয়েছে।
আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়ার পর হল প্রশাসন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৯ জুলাই রাতে। হল প্রশাসনের নোটিশ অনুযায়ী, ওই দিন রাত আনুমানিক ১১টা ৫০ মিনিটে বিজয় একাত্তর হলের যমুনা ব্লকের অতিথিকক্ষ-সংলগ্ন ওয়াশরুম ব্যবহার নিয়ে দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
অপর শিক্ষার্থী আহমেদ শাহরিয়ার নীড় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়ন করছেন।
ওয়াশরুম ব্যবহার নিয়ে প্রথমে নীড় ও মাহফুজের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে নীড়ের সঙ্গে শারীরিকভাবে আক্রমণাত্মক আচরণ করা হয়। তাঁকে হলের অতিথিকক্ষে নেওয়া এবং মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে তাঁকে মারধরের অভিযোগের কথাও বলা হয়েছে।
ঘটনার পর বিষয়টি হল প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়। বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও প্রাধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে।
অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি সরাসরি নিষ্পত্তি না করে তদন্তের উদ্যোগ নেয় হল প্রশাসন। ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং ঘটনার অন্যান্য দিক পর্যালোচনা করে। তদন্ত শেষে কমিটি আব্দুল্লাহ আল মাহফুজের সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পেয়েছে বলে হল প্রশাসনের নোটিশে জানানো হয়।
প্রশাসন ঘটনাটিকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং হলের প্রচলিত শৃঙ্খলার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করেছে। এরপর তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুসারে তাঁর বিরুদ্ধে ছয় মাসের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শাস্তির অংশ হিসেবে শুধু ছয় মাস হলের বাইরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বিজয় একাত্তর হলে মাহফুজের নামে বরাদ্দ থাকা আবাসিক আসনও বাতিল করা হয়েছে। ফলে শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁর আবাসিক অবস্থান কী হবে সেটি হল প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
ঘটনাটিকে ঘিরে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আব্দুল্লাহ আল মাহফুজকে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু প্রতিবেদনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পেছনে সাম্প্রতিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ঘিরে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার প্রসঙ্গ সামনে আনা হচ্ছে। শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের পক্ষে তাঁকে স্লোগান দিতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিশেষ করে ডাকসু নির্বাচনে সাদিক কায়েমের পক্ষে মাহফুজের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনের পর তাঁকে সাদিক কায়েমের পক্ষে স্লোগান দিতে দেখা যাওয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
তবে কোনো প্রার্থীর সমর্থক হওয়া এবং কোনো ছাত্রসংগঠনের সাংগঠনিক কর্মী হওয়া একই বিষয় নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির আব্দুল্লাহ আল মাহফুজকে নিজেদের সাংগঠনিক কর্মী হিসেবে স্বীকার করেনি।
সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মাহফুজের সঙ্গে তাদের কোনো সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা নেই।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডাকসু নির্বাচনে মাহফুজ সাদিক কায়েমকে সমর্থন করেছিলেন। তবে সেই সমর্থনের ভিত্তিতে তাঁকে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক কর্মী হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক নয় বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
ফলে এ ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে হল প্রশাসনের তদন্ত এবং শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রশাসনের নোটিশে মাহফুজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি হিসেবে তাঁর কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা বলা হয়নি। বরং আরেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা এবং হলের শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণকেই কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল ক্যাম্পাসের অন্যতম বড় আবাসিক হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হলটি তিনটি ব্লকে বিভক্ত—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। এখানে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী সংযুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন আবাসিক শিক্ষার্থী। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন সহাবস্থানের কারণে শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক আচরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনাটি আবাসিক হলের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ছোট কোনো বিরোধ দ্রুত বড় সংঘাতে পরিণত হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ওয়াশরুম ব্যবহারের মতো দৈনন্দিন একটি বিষয় নিয়ে শুরু হওয়া বাগ্বিতণ্ডা যদি শারীরিক সংঘাত কিংবা মারধরের হুমকিতে পৌঁছায়, সেটি আবাসিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে এমন ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
বিজয় একাত্তর হল প্রশাসন এ ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই শাস্তি দেওয়ার কথা প্রশাসনিক নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়ার তথ্য যেমন সামনে এসেছে, তেমনি অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চলছে। ছাত্রশিবির সেই সাংগঠনিক সম্পর্ক অস্বীকার করেছে।
এ কারণে পুরো ঘটনাকে শুধু দুই ছাত্রসংগঠনের রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখলে হল প্রশাসনের তদন্তে পাওয়া মূল শৃঙ্খলাজনিত বিষয়টি আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা নির্বাচনে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে বেশি বা কম গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণই প্রধান বিবেচ্য হওয়া প্রয়োজন।
হল প্রশাসনের সিদ্ধান্তেও আপাতত সেই প্রক্রিয়ার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়ার পর মাহফুজের বিরুদ্ধে ছয় মাসের বহিষ্কার এবং আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও ন্যায়সংগত শৃঙ্খলা প্রক্রিয়ার অংশ।
বিজয় একাত্তর হলের এ ঘটনা তাই একটি ওয়াশরুম ব্যবহার নিয়ে দুই শিক্ষার্থীর বিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তদন্ত, শাস্তি এবং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আপাতত হল প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ ছয় মাস বিজয় একাত্তর হলে থাকতে পারবেন না। তাঁর আবাসিক আসনও বাতিল থাকবে। অন্যদিকে ছাত্রশিবির স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, মাহফুজ সংগঠনটির সমর্থিত ডাকসু প্রার্থীকে সমর্থন করলেও তাঁর সঙ্গে তাদের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই।