এসএসসি ফলে কোন বোর্ডে পাশের হার কত

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৭ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাশের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। গত বছর এই হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গড় পাশের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট।

একই সঙ্গে কমেছে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থী। ফলে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয় ফলাফল বিশ্লেষণ। কে কত নম্বর পেল, কোন শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার বেশি এবং কোথায় তুলনামূলকভাবে কম—এসব বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

এবার দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার গড় পাশের হার দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। গত বছর নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাশের হার ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। ফলে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ক্ষেত্রেও পাশের হার কমেছে প্রায় চার শতাংশ পয়েন্ট।

বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে এবার সবচেয়ে বেশি পাশের হার অর্জন করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডে পাশের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকার ফলাফল এবার সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। রাজধানীসহ ঢাকা বিভাগের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এই বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফলে বোর্ডটির ফলাফল সামগ্রিক এসএসসি ফল বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ঢাকা বোর্ডের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাশের হার যশোর শিক্ষা বোর্ডে। এই বোর্ডে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এরপর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড, যেখানে পাশের হার ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ।

অন্যান্য সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এই হার ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।

সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ফলে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে এবার সর্বনিম্ন পাশের হার দেখা গেছে ময়মনসিংহ বোর্ডে।

সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বাইরে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষার পাশের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় পাশের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সব বোর্ড মিলিয়ে সবচেয়ে কম পাশের হার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে।

দাখিল পরীক্ষার ফলাফলেও এবার শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও ব্যর্থতার মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৭৪১টি কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়। মোট ফলাফলে পাশের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। এর ফলে একদিকে বোর্ডটির সামগ্রিক পাশের হার নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের সাফল্যও সামনে এসেছে।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। এর মধ্যে সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছিল ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন। আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় ফরম পূরণ করেছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থী।

ফলাফলের পরিসংখ্যান বলছে, এবার শিক্ষার্থীদের জন্য এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে কঠিন প্রতিযোগিতার একটি পর্যায় ছিল। পাশের হার এবং জিপিএ-৫ উভয় ক্ষেত্রেই গত বছরের তুলনায় নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। তবে শুধু পাশের হার কমে যাওয়াকে শিক্ষার মানের অবনতি হিসেবে দেখার আগে প্রশ্নপত্রের কাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠদানের পরিবেশ এবং অন্যান্য বাস্তব কারণ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বোর্ডগুলোর মধ্যে ফলাফলের পার্থক্যও শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। একটি বোর্ডে যেখানে পাশের হার ৭১ শতাংশের বেশি, অন্যদিকে কোনো বোর্ডে তা ৬০ শতাংশের নিচে। এই পার্থক্যের পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, শিক্ষকসংকট, শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগ, অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক বাস্তবতার মতো বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ফলাফলের দিন শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেদের অর্জনকে ভবিষ্যতের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা। যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে, তারা যেমন আনন্দের সঙ্গে পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি নেবে, তেমনি প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। এসএসসি পরীক্ষা শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি নয়।

ফল প্রকাশের পর এখন অনেক শিক্ষার্থীর সামনে নতুন সিদ্ধান্তের সময় এসেছে। কলেজে ভর্তি, বিভাগ বা বিষয় নির্বাচন এবং উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম ফল করা শিক্ষার্থীদের জন্যও নিজেদের আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষার পথ বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে ফল পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগও রাখা হয়েছে। প্রকাশিত ফল নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের সন্দেহ থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা যাবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা যাবে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিক্ষার্থীরা তাদের ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করতে পারবে।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল তাই একই সঙ্গে সাফল্য, প্রত্যাশা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ পাশের হার সর্বোচ্চ অবস্থান তৈরি করেছে, অন্যদিকে মাদ্রাসা বোর্ডের ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ পাশের হার সবচেয়ে নিচে রয়েছে। নয়টি সাধারণ বোর্ডের সামগ্রিক ফলও গত বছরের তুলনায় কমেছে।

এখন ফলাফলের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ। কোন অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা কেন পিছিয়ে পড়ছে, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো ফলের পেছনে কী ধরনের উদ্যোগ কাজ করছে এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের শেখার মান কীভাবে বাড়ানো যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।

কারণ একটি পরীক্ষার ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার হিসাব নয়; এটি একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা, সুযোগের সমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার সক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। এবারের ফলাফল সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com