প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে অর্থবহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেছেন যে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করা হলে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাদের মনোনীত প্রার্থী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের বিজয়ী হওয়ার এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যথেষ্ট জোরালো সম্ভাবনা ছিল। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা ফিরিয়ে আনার তাগিদ থেকেই এই প্রার্থী দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এই সাংবিধানিক পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা একপাক্ষিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ওপরও তিনি বিশেষ জোর দেন।
সোমবার নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয় থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়। ফরম সংগ্রহের পর আয়োজিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ জানান যে, এই নির্বাচনে তাদের জোটের পক্ষ থেকে জয় বা পরাজয়কে মূল বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রে সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের মূল চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন যে, রাষ্ট্রের সর্বস্তরের শাসনব্যবস্থা যদি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকে, তবে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী বা প্রধান সাংবিধানিক পদটিতেও সবার অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বর্তমান আইনি কাঠামো ও সংবিধানে থাকা কিছু জটিলতার কারণে সেই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতে ইসলামীর এই শীর্ষ নেতা বলেন যে, জুলাই সনদের অঙ্গীকার এবং পরবর্তীতে সংঘটিত গণভোটের রায় যদি যথাযথভাবে ও পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হতো, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের আওতাভুক্ত হয়ে আসত। আর যদি এই অনুচ্ছেদটি সংস্কার করা সম্ভব হতো, তবে জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্যরা দলীয় কোনো ধরনের কঠোর হুইপ বা শৃঙ্খলার অন্ধ অনুসারী না হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের বিবেক ও বিবেচনা অনুযায়ী ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেতেন। তিনি অত্যন্ত রূপক অর্থে মন্তব্য করেন যে, একদিকে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়, আবার অন্যদিকে তাদের সেই স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ বজায় রাখা হয়, যা অনেকটা ‘পাখির মতো স্বাধীন হলেও হাত-পা বেঁধে রাখার শামিল’। সংসদ সদস্যদের এই স্বাধীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গেলে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে একটি অনুকূল ও বিজয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত বলে তিনি দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেন।
ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও বর্ণিল কর্মজীবন এবং দেশের জন্য তার ঐতিহাসিক অবদানের কথা তুলে ধরে হামিদুর রহমান আযাদ জানান যে, তিনি একজন অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ, রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবসেক্টর কমান্ডার হিসেবে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ ও সফল কর্মজীবন ছাড়াও তিনি তাঁর কর্মজীবনে চারবার সফলভাবে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। শুধু তাই নয়, শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও তিনি একজন পিএইচডিধারী দক্ষ ব্যক্তিত্ব, যাঁর সততা, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো ধরনের বিতর্ক নেই। এমন একজন বর্ষীয়ান ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপতি প没有 হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে পেরে ১১ দলীয় ঐক্য গর্বিত বোধ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ও সংবিধানের প্রচলিত নিয়মের বেড়াজালে দেশের জনগণ এবং রাষ্ট্র একজন অত্যন্ত দক্ষ ও যোগ্য মানুষের সেবা থেকে বঞ্চিত হলো বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে হামিদুর রহমান আযাদ ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, সেই সময়েও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা ও মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেই সংসদে জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলোর সুনির্দিষ্ট আসন সংখ্যা থাকার কারণে এবং রাজনৈতিক দলগুলো সঠিক ভূমিকা পালন করায় নির্বাচনের মাঠে একটি সত্যিকারের লড়াইয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। তবে বর্তমান সংসদে একটি দলের বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে সেই প্রথাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়লেও তারা নৈতিক অবস্থান থেকে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, ক্ষমতাসীনরা গণভোটের রায় ও সংস্কারের দাবিগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কারণে সংসদ সদস্যরা তাদের পূর্ণ স্বাধীনতায় ভোট প্রদান করতে পারছেন না। তা সত্ত্বেও দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে, সুস্থ রাজনীতির ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তারা শেষ পর্যন্ত তাদের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।