প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আধুনিক প্রযুক্তিজগতের বিপ্লব সাধনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণাগারের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের ব্রাউজার এবং নানা ডিজিটাল ডিভাইসে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে উন্নত সব এআই চালিত এজেন্ট। কিন্তু প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে সাইবার নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান জেনিটির গবেষকেরা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তাদের সুনির্দিষ্ট গবেষণা অনুযায়ী, ওপেনএআইয়ের তৈরি অত্যন্ত জনপ্রিয় এআই ব্রাউজার ‘অ্যাটলাস’-কে সুকৌশলে বিভ্রান্ত বা প্রতারিত করে কোনো ইউজারের হোয়াটসঅ্যাপ ওয়েব অ্যাকাউন্ট থেকে সম্পূর্ণ গোপনে তার পরিচিত ও প্রিয়জনদের কাছে যেকোনো বার্তা পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব। এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আবিষ্কার সাইবার নিরাপত্তার ইতিহাসে এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে মারাত্মক সাইবার অপরাধের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে সঙ্গে মেটার মালিকানাধীন জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট ও তথ্য সুরক্ষায় নিয়মিতভাবে অত্যন্ত কড়া ও নতুন নতুন নিরাপত্তাসুবিধা বা প্রাইভেসির ফিচার যুক্ত করে আসছে। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের বিশ্বখ্যাত ‘ব্ল্যাক হ্যাট’ সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলনে জেনিটির গবেষক দলটি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এআই ব্রাউজার এজেন্টের নিরাপত্তা ফাঁকফোকড় এবং এর মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে গোপনে বার্তা পাঠানোর পুরো কৌশলটি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেন। গবেষকেরা তাদের বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন যে, এই বিপজ্জনক আক্রমণে হোয়াটসঅ্যাপের নিজস্ব কোনো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাত্রুটি বা বাগ ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি অ্যাপটির দুর্ভেদ্য এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন প্রযুক্তির নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও কোনোভাবেই ভাঙা হয়নি। পুরো আক্রমণ বা জালিয়াতি সম্পন্ন হয়েছে মূলত এআই ব্রাউজার এজেন্টকে বিশেষ ও প্রতারণামূলক বা প্রম্পটিং নির্দেশনার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করে, যা প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারের ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

জেনিটির এই সুদূরপ্রসারী গবেষণায় কেবল ওপেনএআই নয়, বরং গুগল, অ্যানথ্রপিক, মাইক্রোসফট এবং পারপ্লেক্সিটির মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি জায়ান্টদের এআই ব্রাউজার ও ব্রাউজার এক্সটেনশনগুলোর ভেতরে থাকা ২০টিরও বেশি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, হ্যাকার বা অসৎ চক্র এই দুর্বলতাগুলোর সহজ সুযোগ নিয়ে ব্যবহারকারীর কম্পিউটারের ভেতর সুরক্ষিত থাকা ব্যক্তিগত ফাইলগুলো গোপনে সংগ্রহ করে ফেলতে পারে। এ ছাড়া দূর থেকে ব্যবহারকারীর মূল যন্ত্রে অননুমোদিত প্রবেশাধিকার অর্জন, পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নেওয়া কিংবা জনপ্রিয় অনলাইন শপিং সাইট অ্যামাজনে ব্যবহারকারীর অজান্তেই অনুমতি ছাড়া কেনাকাটার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করিয়ে নেওয়া সম্ভব। এই ধরনের নিখুঁত সাইবার আক্রমণ ডিজিটাল ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রচলিত ব্রাউজারগুলোর প্রথাগত নিরাপত্তাব্যবস্থা যুগের পর যুগ ধরে মানুষের সাধারণ আচরণ ও ডিজিটাল অভ্যাসের কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হয়ে থাকে। কিন্তু যখন একটি এআই এজেন্ট পুরো ব্রাউজারের বুদ্ধিদীপ্ত নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন সেই চেনা সুরক্ষার দেয়ালগুলো সব সময় আর সঠিকভাবে কার্যকর থাকে না। এমনকি বিশ্বমানের বিভিন্ন ওয়েবসাইটের ভেতরে অননুমোদিত তথ্য ও ডেটা আদান-প্রদান কঠোরভাবে ঠেকাতে ব্যবহৃত ‘সেম-অরিজিন পলিসি’ বা মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে এআই চালিত এজেন্টের কারণে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ, ব্রাউজারে যুক্ত হওয়া এই স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টগুলো অজান্তেই সাইবার সুরক্ষায় এক বিশাল ফাঁক তৈরি করছে, যা সাধারণ মানুষের ডিজিটাল জীবনকে প্রতিনিয়ত এক অজানা ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জেনিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা তথা সিটিও মাইকেল বার্গুরি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী ওয়ার্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, আধুনিক ব্রাউজারগুলোর নিরাপত্তার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ দিন দিন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, প্রায় দুই দশক আগের আদিম ব্রাউজারভিত্তিক সাইবার হামলার ভয়াবহ ঝুঁকিগুলো আবারও নতুনূপে ফিরে আসছে। একটি শক্তিশালী এআই এজেন্ট যদি একবার একটি ব্রাউজারের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিজের আয়ত্তে পেয়ে যায়, তবে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট, গোপনীয় চ্যাট, সংবেদনশীল তথ্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়বে। প্রযুক্তির এই ভয়াবহ অপব্যবহার রোধে বিশ্বজুড়ে এখনই কঠোর ও কার্যকর সাইবার নীতিমালা তৈরি করা না হলে আগামী দিনে ডিজিটাল নিরাপত্তা রক্ষা করা এক অসম্ভব লড়াইয়ে পরিণত হবে।