সর্বশেষ :

হার্ট অ্যাটাকের পর মানসিক অবসাদ ও মুক্তির উপায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
হার্ট অ্যাটাকের পর মানসিক অবসাদ ও মুক্তির উপায়
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবজীবনের সবচেয়ে মহিমান্বিত ও সংবেদনশীল অঙ্গ হলো আমাদের হৃৎপিণ্ড, যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যায়। কিন্তু আধুনিক এই যান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ জীবনে হৃদরোগ যেন এক আতঙ্কের অপর নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো মানুষ যখন হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন কিংবা ওপেন হার্ট সার্জারির মতো বড় ধরনের কোনো অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হন, তখন তার শারীরিক সংগ্রামটি সবার চোখেই পড়ে। চারপাশের সবাই তখন তার শারীরিক সুস্থতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, হাসপাতালে ছোটাছুটি করেন এবং চিকিৎসকদের নির্দেশনা মেনে চলেন। কিন্তু শারীরিক এই যুদ্ধ জয় করে যখন একজন রোগী বাড়ি ফিরে আসেন, তখন তার মনের ভেতরে যে এক অদৃশ্য ও তীব্র ঝড় বয়ে যায়, তা অনেক সময়ই সবার দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় এই জটিল মানসিক অবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়, যা মূলত কার্ডিয়াক ব্লুজ বা কার্ডিয়াক ডিপ্রেশন নামে পরিচিত।
অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর হার্ট হেলথ-এর সাম্প্রতিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য অনুযায়ী, হৃদরোগে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়া অথবা হার্ট সার্জারির মতো কঠিন চিকিৎসা প্রক্রিয়া পার করার পর প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগীই কোনো না কোনোভাবে এই গভীর মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনে ভুগে থাকেন। পরিসংখ্যানের এই বিশাল হার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেবল হার্টের চিকিৎসা করলেই রোগীর পূর্ণাঙ্গ নিরাময় নিশ্চিত হয় না। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার তীব্র অভিজ্ঞতা, শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা এবং আকস্মিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনে বাধ্য হওয়া একজন মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর শূন্যতা ও ভীতির সৃষ্টি করে। মানুষটি হয়তো শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছেন, কিন্তু তার অবচেতন মন তখনো সেই মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার ভয়াবহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে।
এই ধরনের মানসিক সংকটকে সময়মতো শনাক্ত করা এবং এর মূল লক্ষণগুলো বুঝতে পারা পরিবার ও স্বজনদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত হার্ট অ্যাটাক বা বড় ধরনের হার্ট সার্জারি পার করার পর প্রথম ছয় সপ্তাহের ভেতর এই অবসাদের লক্ষণগুলো খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করে। রোগীকে যদি দেখা যায় যে তিনি সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে চুপচাপ বসে আছেন, নিজের চেনা জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন এবং কারো সঙ্গে মিশতে চাইছেন না, তবে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। একসময় যে মানুষটি লেখালেখি, আড্ডা, বাগান করা কিংবা গান শোনার মতো শখের কাজগুলোতে অত্যন্ত আনন্দ পেতেন, হঠাৎ করেই তিনি সেসব পছন্দের কাজ থেকে সম্পূর্ণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং তার কথাবার্তাও অনেক কমে যায়। নিজের ভগ্ন স্বাস্থ্য এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সারাক্ষণ মাথার মধ্যে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কের জাল বুনতে শুরু করেন, যা তাকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে পঙ্গু করে তোলে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতো বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মতে, কার্ডিয়াক ডিপ্রেশনের এই মারাত্মক অন্ধকার থেকে একজন রোগীকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হলে কেবল কার্ডিওলজিস্ট বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা নিলেই চলে না, বরং এর পাশাপাশি একজন দক্ষ সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও সহায়তা নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। মানসিক এই ক্ষত শুকানোর জন্য অনেক সময় বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে সাইকোথেরাপি বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধেরও প্রয়োজন হতে পারে, যা রোগীর মনের ভেতরের জমে থাকা ভয় ও অতঙ্কের মেঘ কেটে ফেলতে সাহায্য করে। পরিবার ও আপনজনদের ভালোবাসা এবং সহানুভূতিশীল আচরণ এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় ও অব্যর্থ ওষুধ হিসেবে কাজ করে। রোগীকে কখনোই একা ফেলে না রেখে তাকে বোঝাতে হবে যে তিনি এই লড়াইয়ে একা নন, তার পাশে পুরো পরিবারটি সবসময় ছায়ার মতো রয়েছে।
দৈনন্দিন জীবনের ছোট কিছু ইতিবাচক অভ্যাসের পরিবর্তনও কার্ডিয়াক ডিপ্রেশনের মতো সমস্যা দূর করতে জাদুর মতো কাজ করতে পারে। ঘরবন্দি বা কোণঠাসা জীবনযাপন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিবার ও পুরোনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং মনের জমে থাকা ভয় বা কষ্টের কথাগুলো খোলামেলাভাবে শেয়ার করা উচিত। এতে মনের ভেতরের গুমোট ভাব কেটে গিয়ে এক ধরনের মানসিক স্বস্তি ফিরে আসে। এ ছাড়া চিকিৎসকের নির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে নিয়মিত হালকা শারীরিক পরিশ্রম, যেমন সকালে বা বিকেলে চিকিৎসকের কথামতো কিছু সময় মৃদু গতিতে হাঁটাচলা করা কিংবা হালকা ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করা শরীর ও মন উভয়ের জন্যই অত্যন্ত উপকারী। শারীরিক এই সামান্য পরিশ্রম মস্তিষ্কে ভালো লাগার হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা রোগীকে দ্রুত মানসিক অবসাদ কাটিয়ে প্রাণবন্ত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে গভীরভাবে উৎসাহিত করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত