প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আবারও এক হৃদয়বিদারক এবং অপ্রত্যাশিত আলোচনার জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল দলের প্রধান কোচ জেরার্ড জোন্সের আকস্মিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ এই কোচ তার ভেরিফায়েড পেজে চরম হতাশা, আতঙ্ক ও আর্থিক সংকটের কথা প্রকাশ করে একটি দীর্ঘ পোস্ট ও ভিডিও বার্তা শেয়ার করার পর থেকেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার থেকে দূরে থাকা একজন বিদেশি পেশাদার কোচের এমন অসহায়ত্ব এবং তার বেতনের অর্থ ও নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা ক্রীড়াপ্রেমী ও সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফুটবল পাড়ায় যখন নতুন কোনো অর্জনের সুসংবাদ আসার কথা, ঠিক সেই সময়ে কোচের এই আর্তনাদ দেশের ফুটবল প্রশাসনের ওপর এক বড় ধরনের নৈতিক প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই আবেগঘন বার্তায় উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচ জেরার্ড জোন্স অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তার চরম মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ঠিক সময়ে বেতনের অর্থ হাতে না পাওয়ায় তিনি সুদূর ইংল্যান্ডে অবস্থানরত তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো অর্থও পাঠাতে পারছেন না। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট এবং এর সঙ্গে যোগ হওয়া চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা তাকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর আতঙ্ক প্রকাশ করে তিনি জানান যে, যশোরের শামসুল হুদা একাডেমিতে আবাসিক ক্যাম্প চলাকালীন সময়ে এবং ঢাকায় আসার পর তাকে বেশ কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাস্তাঘাটে বা বিভিন্ন জায়গায় অচেনা মানুষ গাড়ির কাছে এসে ধাক্কা দেওয়া, গাড়ি ঘিরে ধরে জোরপূর্বক টাকা চাওয়া কিংবা ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সাহায্যের জন্য অনবরত চাপের মুখে পড়ার মতো ঘটনা তাকে অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও অসহায় এক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

এই চরম হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে দুপুরের দিকে দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় জেরার্ড জোন্স আরও বেশি ভেঙে পড়েন। তিনি কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে জানান যে, প্রতিদিন যেন তার জীবনে নতুন নতুন ধাক্কা আসছে এবং আজকের অভিজ্ঞতাগুলো তাকে ভেতরে-ভেতরে একেবারে শেষ করে দিয়েছে। নিজের পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে না পারার যন্ত্রণা তাকে একজন ব্যর্থ স্বামী ও পিতা হিসেবে অপরাধবোধে ভোগাচ্ছে। তিনি বলেন, পেশাদার কোচিংয়ের দায়িত্ব পালন করতে এসে তিনি নিজেকে যেভাবে একাকী, বিপন্ন এবং চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আবিষ্কার করেছেন, তা তিনি কল্পনাই করেননি। কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা ছাড়াই যেন তিনি কেবল নিজের পেশাদার কাজটি স্বাধীনভাবে করতে পারেন, সেই আকুল আবেদনই তিনি বারবার জানিয়েছেন।
কোচের এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ও আর্তনাদের বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বা বাফুফে। বাফুফের দায়িত্বশীল সাধারণ সম্পাদক সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, কোচের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে তার নির্ধারিত বেতন পরিশোধ করার কথা রয়েছে এবং সেই নিয়ম মেনেই যথাসময়ে কোচের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতনের টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাফুফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে টাকা পাঠানোর পর কেন এই জটিলতা তৈরি হলো বা কোচের শেষ পর্যন্ত কী সমস্যা হয়েছে, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল নন। তবে বাফুফের অন্য একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে যে, বিদেশি মুদ্রায় বেতনের টাকা নিজ দেশে বা যুক্তরাজ্যে পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছু ব্যাংকিং ও আইনি প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ বা প্রক্রিয়া থাকে, যা সম্পন্ন করতেই হয়তো কোচ স্বয়ং আজ দুপুরের দিকে যশোর থেকে রাজধানী ঢাকায় ছুটে এসেছেন।

গত জুন মাসে বাংলাদেশের যুব দলের প্রধান কোচের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন এই ইংলিশ কোচ। অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে দেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি বাংলাদেশে কাজ শুরু করেছিলেন। অথচ বর্তমান সময়ে দেশের মাটিতে তার এই চরম মানসিক বিপর্যয় ও নিরাপত্তাহীনতার চিত্র এক বেদনাদায়ক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে বাফুফের পক্ষ থেকে সময়মতো বেতন পরিশোধের দাবি এবং অন্যদিকে কোচের পকেট শূন্য থাকার অভিযোগ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে ঠিক কোথায় ঘটছে যোগাযোগের বড় ধরনের ঘাটতি। একজন বিদেশি কোচ যখন ভিনদেশে এসে এমন অসহায় বোধ করেন, তখন তা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ভাবমূর্তির ওপরও এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দ্রুত এই সংকটের একটি সুষ্ঠু ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা হওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে কোচ তার মনের সব আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দেশের ফুটবল উন্নয়নে পুনরায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন।