সর্বশেষ :

অর্থপাচারে জড়িত আরও ৪২ ঋণখেলাপি গ্রুপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
অর্থপাচারে জড়িত আরও ৪২ ঋণখেলাপি গ্রুপ
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ধসিয়ে দিয়ে দেশের ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করার অভিযোগে আরও নতুন করে ৪২টি প্রভাবশালী ঋণখেলাপি গ্রুপকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ। দেশের আর্থিক খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এবং জনগণের আমানতের অর্থ বিদেশে পাচার করার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পর গোটা দেশে নতুন করে তীব্র আলোচনার ঝড় উঠেছে। এর আগে থেকেই শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি শিল্প গ্রুপের অর্থপাচারের ঘটনা তদন্তাধীন থাকলেও এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর ডেটাবেজ কঠোরভাবে পর্যালোচনা করে আরও ৪২টি বড় মাপের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এই ৪২টি প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপি ঋণের পাহাড়সম পরিমাণ হিসাব করা হয়েছে প্রায় ২৫৪ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দুই দশমিক পঞ্চান্ন বিলিয়ন ডলার এবং দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকারও বেশি। দেশের অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে পাচার করা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পুনরায় দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো এবং দেশের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ শুরু করেছে।
বিএফআইইউর নিবিড় অনুসন্ধান ও ব্যাংকিং খাতের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে, চিহ্নিত হওয়া এই ৪২টি প্রভাবশালী ঋণখেলাপি গ্রুপের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে বিদেশে অর্থ পাচার করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হলো এসবি এক্সিম গ্রুপ, ঐতিহ্যবাহী ও বহুল আলোচিত হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ এবং সাদ মুসা গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেবল প্রাথমিক অনুসন্ধানেই মাত্র চারটি প্রধান গ্রুপ কর্তৃক পাচার করা অর্থের সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ প্রায় ২২ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলার। পৃথকভাবে হিসাব করলে দেখা যায় যে, এসবি এক্সিম গ্রুপ একাই প্রায় দুই কোটি ৬৮ লাখ ডলার, হাবিব গ্রুপ প্রায় ১৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার, ইয়াসীর গ্রুপ প্রায় চার কোটি ডলার এবং এডব্লিউআর গ্রুপ প্রায় দুই কোটি ডলার বিদেশে পাচার করেছে। দেশের মানুষের কষ্টের জমানো আমানত ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বের করে নিয়ে এভাবে বিদেশে বিলাসবহুল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার এই ঘটনায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে দেশের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠোর নির্দেশনায় শীর্ষস্থানীয় ১১টি শিল্প গ্রুপের ব্যাংক লুটপাট, অর্থপাচার, কর ফাঁকি এবং অন্যান্য বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা খুঁজে বের করার জন্য একটি বিশেষ যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছিল। পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং সেই সময়ের আলোচিত ১০টি শিল্প গ্রুপের দেশ ও বিদেশে অবৈধ উপায়ে অর্জিত মোট প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি ও সম্পদ ইতিমধ্যে সরকারের তরফ থেকে কঠোরহস্তে জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। সেই তালিকায় থাকা প্রধান শিল্প গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ এবং আরামিট গ্রুপ। দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের সমন্বয়ে গঠিত সেই যৌথ তদন্ত দলের দীর্ঘ ও সাহসী প্রচেষ্টার ফলেই ওই বিশাল অংকের সম্পদ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে এই সফল অভিযানের ধারাবাহিকতাই দ্বিতীয় দফায় সম্প্রসারিত করে নতুন এই ৪২টি ঋণখেলাপি গ্রুপকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিদেশের মাটিতে লুকিয়ে রাখা এই বিশাল অংকের পাচারকৃত অর্থ এবং সম্পদ অক্ষত অবস্থায় সফলভাবে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও পেশাদার পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই মহাযজ্ঞ পরিচালনার অংশ হিসেবে বিশ্বের নামজাদা আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় দফায় চিহ্নিত হওয়া এই ৪২টি প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এবং তাদের বিদেশে থাকা গোপন সম্পদের অবস্থান খুঁজে বের করতে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেল্লি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটসের মতো বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক তদন্তকারী ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়োজিত করা হয়েছে। বিশ্বমানের এই আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে ছড়িয়ে থাকা এই ৪২টি প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থের প্রাথমিক উৎস ও সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও যুগান্তকারী দিক হলো, এই আন্তর্জাতিক আইনি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে সম্পূর্ণ ‘নো উইন, নো পে’ বা সফলতার শর্তের ভিত্তিতে। অর্থাৎ, এই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের অগ্রিম ফি বা কার্যনির্বাহী খরচ গ্রহণ করবে না। তারা সুদূর প্র বিদেশে আত্মগোপন করে থাকা বা বিভিন্ন বেনামি অ্যাকাউন্টে রক্ষিত সম্পদ নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে এবং তা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সফলভাবে উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনতে পারলে তবেই উদ্ধারকৃত মোট অর্থের একটি নির্দিষ্ট পূর্বনির্ধারিত অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে লাভ করবে। ফলে সরকারের কোষাগার থেকে কোনো ধরনের আর্থিক ঝুঁকি ছাড়াই বিশ্বমানের আইনি সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্থানীয় আইন ও আদালতের নির্দেশনা মেনে প্রথমে বিদেশে থাকা ঋণখেলাপিদের সম্পদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় ফ্রিজ বা জব্দ করার ব্যবস্থা নেবে। এরপর আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশের মাধ্যমে সেই সম্পদ বিক্রি বা আইনগত উপায়ে নিষ্পত্তি করে প্রাপ্ত অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
সম্প্রতি এই বিশাল আর্থিক দুর্নীতির অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে দেশের ৩৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে গভর্নর মহোদয় পাচার হওয়া জাতীয় সম্পদ পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যাংকগুলোকে আরও অধিকতর গতিশীল ও তৎপর হওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় জানান যে, দেশ থেকে অন্যায়ভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে এবং সেই অর্থ ফেরত আনার জন্য দেশের ব্যাংকগুলো এখন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন যে, ভবিষ্যতে যাতে কোনো কুচক্রী মহল এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনা আর ঘটাতে না পারে, সেজন্য কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পাচার করা কত অর্থ শেষ পর্যন্ত শতভাগ ফেরত আনা সম্ভব হবে, সেটি দ্বিতীয় বিষয় হলেও যারা এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তারা যেন কোনোভাবেই শাস্তি থেকে রেহাই না পায়, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মানিত মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এই পুরো প্রক্রিয়াটির আইনি ও প্রশাসনিক দিকগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি জানান যে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদের সঠিক অবস্থান, ধরন এবং আর্থিক পরিমাণ নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সম্পদ চিহ্নিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রের স্থানীয় আইন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে সেগুলো জব্দ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এই বহুমুখী ও সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন সুদূর প্রবাসে পাচার হয়ে যাওয়া দেশের অমূল্য জাতীয় সম্পদগুলো পুনরুদ্ধার করার এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ও অনাদায়ী বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ সফলভাবে আদায় করা সম্ভব হবে। দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভকে চাঙ্গা করতে এবং সুশাসন ফিরিয়ে আনতে সরকারের এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত