প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ভূরাজনীতির কূটকৌশল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার গতিপ্রকৃতিতে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান সামরিক শক্তিগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে দিয়ে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়েছে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত এই নতুন কৌশলগত মৈত্রী শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্যই নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্ব তথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কেড়েছে। আর এই ঐতিহাসিক চুক্তির রেশ কাটতে না কাটতেই পাকিস্তানের এই অনন্য কূটনৈতিক ও সামরিক অর্জনে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও কৌশলগত মিত্র রাষ্ট্র কুয়েত। দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের কূটনৈতিক আলাপচারিতায় এই অভিনন্দন বার্তা উচ্চারিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বন্ধুত্বের এক নতুন বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই অভিনন্দনের বিষয়টি প্রকাশ করা হয়। ওই বিবৃতিতে জানানো হয় যে, কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাররাহ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের মধ্যে সম্প্রতি গভীর রাতে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। মধ্য রাতের এই বিশেষ ফোনালাপে কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। কুয়েতের পক্ষ থেকে এই শক্তিশালী মৈত্রী চুক্তিকে সাধুবাদ জানানো প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্য ও এশীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে নতুন এই জোট কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে।

দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপে কেবল প্রতিরক্ষা চুক্তির অভিনন্দন বিনিময়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার চলমান সংঘাতময় ও জটিল আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত গভীর ও বিস্তারিত মতবিনিময় হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম জ্বলন্ত ও স্পর্শকাতর ইস্যু—অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের বর্তমান শোচনীয় ও সংকটজনক পরিস্থিতিও তাদের আলোচনায় বিশেষ স্থান দখল করে নেয়। ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উভয় নেতা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশ্বমঞ্চে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভ্রাতৃপ্রতিম এই দেশগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ ভবিষ্যতে আরও জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
এ ছাড়া ফোনালাপে পাকিস্তান ও কুয়েতের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বহুমুখী বিষয় নিয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সম্প্রতি কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পাকিস্তান সফরের পর গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং তার পরবর্তী সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো নিয়ে দুই নেতা খোলামেলা কথা বলেন। বিশেষ করে বাণিজ্য, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং জনশক্তি রপ্তানিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিশাল বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোকে আরও বহুগুণ জোরদার করার কার্যকর উপায়গুলো নিয়ে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করেন। ভ্রাতৃপ্রতিম দুই দেশের এই সুদৃঢ় সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও উচ্চ শিখরে পৌঁছাবে বলে উভয় দেশের কূটনৈতিক মহল দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
এই আঞ্চলিক মৈত্রীর মূল ভিত্তি স্থাপিত হয় গত শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র ও ঐতিহাসিক নগরী মক্কায় অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে। যেখানে তুরস্কের শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি আরবের দূরদর্শী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অত্যন্ত যুগান্তকারী এক কূটনৈতিক পদক্ষেপে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেন। বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম সেরা এই তিন নেতার ঐতিহাসিক এই স্বাক্ষর মুসলিম বিশ্বের সামরিক ও কৌশলগত ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা দূর করতে এই চুক্তি এক বিরাট রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ঐতিহাসিক এই চুক্তির মূল শর্ত ও রূপরেখা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুদূরপ্রসারী। চুক্তি অনুযায়ী, এই তিন চুক্তিবদ্ধ দেশের যেকোনো একটির ওপর যদি কোনো ধরনের সশস্ত্র বহিরাগত আক্রমণ বা আগ্রাসন চালানো হয়, তবে তাকে তিন দেশের সবার ওপরই সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ তুরস্ক, সৌদি আরব বা পাকিস্তানের যেকোনো একটির সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হলে বাকি দুটি দেশ সমবেতভাবে সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে। এই সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্য ও এশীয় অঞ্চলের সামগ্রিক প্রতিরোধ সক্ষমতাকে বহুগুণ জোরদার করা এবং তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় ও সম্প্রসারিত করা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ধরনের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট বর্তমান সময়ে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করেন ভূরাজনীতিবিদরা।