সর্বশেষ :

নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৭ বার
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগ
প্রকাশ:  ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব অর্থনীতির চলমান গতিপ্রকৃতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বাণিজ্যিক দিগন্ত উন্মোচন করে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ওশেনিয়া অঞ্চলের অন্যতম উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে অত্যন্ত দূরদর্শী ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও বেশি গতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বহুমুখী করে তোলার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি নিউজিল্যান্ড ট্রেড অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে এই বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমানের সুযোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন। প্রতিনিধিদলে তাঁর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ শাখার যুগ্মসচিব মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ এবং উপসচিব ফারহানা ইসলাম। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড ট্রেড অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজের বা এনজেডটিইর পক্ষে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মার্কেট ম্যানেজার র‍্যাচেল ম্যাকগাকিয়ান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে মূল্যায়ন করে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে আরও সুনির্দিষ্ট ও সম্প্রসারিত করার বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ও খোলামেলা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের আলোচনায় উঠে এসেছে যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই মোট বাণিজ্যের একটি বড় অংশে নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে মূলত দুগ্ধজাত পণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের ধাতব সামগ্রী আমদানির বিষয়টি প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। এর বিপরীতে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি, যার সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে বিশ্ববাজারে দেশের গর্বের ধন হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাত। একপেশে এই বাণিজ্য কাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে দুই দেশের মধ্যকার সামগ্রিক বাণিজ্যকে আরও বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় করা যায়, সে বিষয়ে বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বাণিজ্যকে আরও সম্প্রসারিত করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিউজিল্যান্ডের বাজারে কেবল তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য সম্ভাবনাময় ও অ-পোশাকজাত পণ্যের রপ্তানি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার শক্তিশালী প্রস্তাব পেশ করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের উদীয়মান ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধশিল্প, পরিবেশবান্ধব ও সোনালী আঁশ খ্যাত পাটজাত পণ্য, আন্তর্জাতিক মানের চামড়াজাত সামগ্রী, টেকসই পরিবেশবান্ধব বস্ত্র এবং দ্রুত বর্ধনশীল তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের জন্য নিউজিল্যান্ডের বাজারে নতুন নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। বর্তমান সরকারের নানামুখী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের পণ্যের মান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে, যা এই বাজার সম্প্রসারণের কাজটিকে আরও সহজ ও ফলপ্রসূ করে তুলবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিভিন্ন সূচক ও গ্লোবাল সার্টিফিকেটের কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয় বৈঠকে। বর্তমান সময়ে দেশের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে বিশ্বমানের ওষুধ প্রস্তুত করছে, তাতে নিউজিল্যান্ডের আধুনিক স্বাস্থ্য খাতে সাশ্রয়ী মূল্যে অত্যন্ত মানসম্মত জেনেরিক ওষুধ এবং জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন নিয়মিত সরবরাহের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া দেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি, ফিনটেক শিল্প এবং উদীয়মান ডিজিটাল সেবা খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সাড়ে ছয় লাখের বেশি মেধাবী প্রযুক্তি পেশাজীবীর অনন্য দক্ষতার দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। এই বিশাল জনশক্তির দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিউজিল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ও কোলাবরেশন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের প্রযুক্তি খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে নিউজিল্যান্ডের স্বনামধন্য কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করার জন্য উষ্ণ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের আধুনিকায়ন, বিশেষায়িত পুষ্টিপণ্য উৎপাদন, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক কৃষি-প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদন খাত, নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন টেকনোলজির মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোতে যৌথ বিনিয়োগের দুর্দান্ত সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এই সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিউজিল্যান্ডের উদ্যোক্তারা যেমন বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন ও ব্যবসা সফলভাবে সম্প্রসারণ করতে পারবেন, তেমনি এর মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল ও সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক বাজারেও খুব সহজেই প্রবেশাধিকার লাভ করতে পারবেন।
দুই দেশের মধ্যকার এই সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত করার জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট তিনটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমত, এনজেডটিইর দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া দলের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডার সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপন করা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি ওষুধশিল্প, ইনফরমেশন টেকনোলজি বা আইটি এবং চামড়া খাতের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারকদের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের বড় বড় ব্যবসায়িক ক্রেতাদের নিয়ে একটি কার্যকর ভার্চুয়াল বিটুবি বা বিজনেস টু বিজনেস বৈঠকের আয়োজন করা। তৃতীয়ত, দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ করে তোলা।
এ ছাড়া ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে দুই দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী ও কার্যকর দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়িক পরিষদ বা বিজনেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। পাশাপাশি নিয়মিত বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ এবং নিজস্ব উদ্যোগে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মাঝে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার ও শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের উচ্চপর্যায়ের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উন্নত মানের পণ্য ও সেবা তৈরির সক্ষমতাকে সফলভাবে একত্রিত করতে পারলে একটি অত্যন্ত লাভজনক অংশীদারত্ব গড়ে উঠবে। এই নতুন অর্থনৈতিক উদ্যোগের হাত ধরে আগামী দিনে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে বলে উভয় দেশের বাণিজ্যমহল দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত