প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার কারারচর এলাকায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপ এবং অবৈধ জ্বালানি ব্যবহারের বিরুদ্ধে এক কঠোর ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তিতাস গ্যাসের মূল সঞ্চালন লাইন থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং সম্পূর্ণ বেআইনি উপায়ে গোপন সংযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে গ্যাস ব্যবহার করে আসার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে একাধিক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। একই সাথে এই গুরুতর অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের মোট সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। সরকারের জ্বালানি খাতের অপচয় রোধ এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার এই যুগান্তকারী পদক্ষেপে স্থানীয় সচেতন মহল স্বস্তি প্রকাশ করেছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, গত মঙ্গলবার বিকেলে নরসিংদী জেলা প্রশাসনের কাছে আসা অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদের ভিত্তিতে শিবপুর উপজেলার অত্যন্ত জনবহুল ও শিল্পাঞ্চলখ্যাত মধ্য কারারচর এলাকায় এই বিশেষ ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এই দীর্ঘ ও সফল অভিযানে নরসিংদী জেলা প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ সরাসরি মাঠে থেকে নেতৃত্ব দেন। জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাজ্জাদ হোসেন এবং শিবপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার ভূমি তথা বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এফ এম নাঈম হাসান শুভ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই বিশেষ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন এবং অভিযানে সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য এবং তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নরসিংদী কার্যালয়ের কারিগরি টিমের সহযোগিতায় পরিচালিত এই অভিযানে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসনের টিম মদিনা জুট মিল এলাকার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বহুতল আবাসিক ভবন এবং বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে পান যে, কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন, মিটার বা নিয়মবহির্ভূতভাবে মূল গ্যাস পাইপলাইন থেকে অত্যন্ত গোপনে অবৈধ সংযোগ বা বাইপাস লাইন টেনে প্রতিটি ভবনে বছরের পর বছর ধরে রান্নাবান্না ও অন্যান্য কাজে চুলা জ্বালানো হচ্ছে। গ্যাস চুরির এই অভিনব ও বেআইনি কারসাজি হাতেনাতে ধরে ফেলার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিটি ভবনে প্রবেশ করে সমস্ত অবৈধ সংযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন। গ্যাস লাইন কাটার পাশাপাশি এই দীর্ঘমেয়াদী অপরাধের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অপরাধে এলাকার প্রভাবশালী বাড়ির মালিক এবং অবৈধ সংযোগের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত আওয়াল ভুঁইয়া ও তাঁর ছেলেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থল থেকেই আটক করে।
অবৈধ গ্যাস সংযোগের সাথে জড়িত অসাধু ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয় এবং অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে মোট চারটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। আইন অমান্য করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আর্থিক দণ্ড আরোপ করা হয়। এর মধ্যে এলাকার অবৈধ গ্যাস সংযোগের মূল হোতা এবং বাড়ির মালিক আওয়াল ভুঁইয়াকে আটক করার পর তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া এলাকার অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রৌশন আক্তারকে চল্লিশ হাজার টাকা, মো. মুসলেম মিয়াকে এক লাখ টাকা এবং মুক্তা নামের অপর এক ব্যক্তিকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। বিচারিক আদালতের এই তাৎক্ষণিক ও কঠোর রায়ের ফলে এলাকাবাজার ও আশপাশের অপরাধী চক্রের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অভিযান শেষে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক জরুরি আহম্মদ উল্লাহ গণমাধ্যমকে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে বলেন যে, অভিযুক্ত এসব অসাধু বাড়ির মালিকেরা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে গোপনে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ নিয়ে তা ব্যবহার করে আসছিল। আনুমানিক প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস চুরি করে ব্যবহার করার ফলে সরকার ও রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হওয়ার কথা এমন প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ টাকার বিশাল পরিমাণ রাজস্ব বিগত বছরগুলোতে সম্পূর্ণভাবে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় এই প্রাকৃতিক সম্পদ অবৈধভাবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছিল এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি সাধন করছিল। আগামী দিনেও জ্বালানি খাতের এই ধরনের অবৈধ সংযোগ এবং গ্যাস চুরির বিরুদ্ধে নরসিংদী জেলা প্রশাসন ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের এই ধরনের বিশেষ অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।