ডনের গ্রেপ্তার খুলতে পারে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার
ডনের গ্রেপ্তার খুলতে পারে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য
প্রকাশ: ১২ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন অর্থাৎ সবার প্রিয় সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর প্রায় তিন দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই বহুল আলোচিত ঘটনায় এক অভাবনীয় ও নাটকীয় মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে জমাট বেঁধে থাকা রহস্যের বরফ গলাতে এবং মৃত্যুর প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে এবার নতুন করে বড় ধরনের আশার আলো দেখতে শুরু করেছে দেশের কোটি কোটি চলচ্চিত্রপ্রেমী ভক্ত ও নিহতের শোকাহত পরিবার। গত রবিবার সৌদি আরব যাওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে উপস্থিত হওয়ার পর ইমিগ্রেশন পুলিশের নিবিড় নজরদারিতে পড়েন একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ও এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি আশরাফুল হক ডন। দেশত্যাগের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাকে বিমানবন্দর থেকেই আটকে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সিআইডি কর্মকর্তাদের হাতে সঁপে দেওয়া হয়। ডনের এই নাটকীয় গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালের সেই রোমহর্ষক ও বিতর্কিত মৃত্যুর ঘটনায় পুরোনো সব নথি, রাজসাক্ষীর গোপন স্বীকারোক্তি, ১২ লাখ টাকার রহস্যময় চুক্তি এবং দীর্ঘদিনের পরস্পরবিরোধী তদন্তের তথ্যগুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
গত মঙ্গলবার সিআইডি সূত্রে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে কারাবন্দী থাকা খলনায়ক ডনকে ব্যাপক ও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের সেই অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টে ঠিক কী ঘটেছিল, সেদিন রাতে সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, কেন তৎকালীন সময়ে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই নায়কের মৃত্যুকে তড়িঘড়ি করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ঠিক কী কারণে সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই এটিকে একটি পরিকল্পিত ঠান্ডা মাথার খুন বলে দাবি করে আসছে—এই সমস্ত জটিল ও স্পর্শকাতর প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে বের করতে সিআইডির চৌকস দল নতুন উদ্যমে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। গত রবিবার দুপুরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে সৌদি আরব পালিয়ে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে ডন যখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন কম্পিউটারে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটকে দেয়। গত বছর এই ঘটনায় নতুন করে হত্যা মামলা দায়ের হওয়ার পর থেকেই অভিযুক্তদের যেকোনো উপায়ে দেশত্যাগ রোধ করার জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যা ডনের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে।
বিমানবন্দর থেকে আটক করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডনকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়। সিআইডির দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান আদালতে আসামিকে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে কারাগারে আটক রাখার জোরালো আবেদন জানান। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা আসামির জামিন আবেদন সম্পূর্ণভাবে নামঞ্জুর করে তাকে অবিলম্বে কারাগারে প্রেরণের কঠোর নির্দেশ দেন। ডনের এই গ্রেপ্তারের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই পুরো দেশজুড়ে এবং চলচ্চিত্রাঙ্গনে এক অভূতপূর্ব তোলপাড় সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটরের পক্ষ থেকে আদালতে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য ও বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে মামলার তদন্ত নতুন এক গতি লাভ করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের বরাত দিয়ে সিআইডি সূত্র জানিয়েছে যে, ১৯৯৭ সালের একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই মামলার অন্যতম রাজসাক্ষী হিসেবে পরিচিত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি প্রদান করেছিলেন।
আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, সেই সুদীর্ঘ জবানবন্দিতে সালমান শাহকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করার গোপন পরিকল্পনা, এই অপরাধের সাথে জড়িত একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততা এবং বিশাল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ভয়ংকর তথ্য স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল। রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে আরও প্রকাশ করা হয়েছে যে, নিহত সালমানের স্ত্রী সামিরা হকের সাথে বিতর্কিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের অবৈধ সম্পর্কের জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনা আঁটা হয়েছিল এবং খলনায়ক ডনের সাথে এই খুন বাস্তবায়নের জন্য বারো লাখ টাকার একটি সুনির্দিষ্ট আর্থিক চুক্তি হয়েছিল। তবে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাঝে নানা নাটকীয়তা লক্ষ্য করা গেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রাজসাক্ষী রিজভী আহমেদ দাবি করেছেন যে সালমান শাহ আত্মহত্যাই করেছিলেন, যা তার অতীতের ১৬৪ ধারার জবানবন্দির সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। একই সাথে সালমান ও তৎকালীন জনপ্রিয় নায়িকা শাবনূরকে নিয়েও বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেছেন তিনি, যা নিয়ে চলচ্চিত্র জগতেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ত্রিশ বছর আগের সেই জবানবন্দি এবং সাম্প্রতিক বক্তব্যের এই বিশাল ফারাক এবং বিরোধ কেন সৃষ্টি হলো, তা এখন সিআইডির তদন্তের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছে যে, ঘটনার দিন নিহতের স্ত্রী সামিরা হক ও তার সহযোগীরা পরিবারের সদস্যদের ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিলেন। প্রোডাকশন ম্যানেজারের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে পরিবারের লোকজন যখন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন তারা দেখতে পান যে সালমানের নিথর দেহ সিলিংয়ের ফ্যানের সাথে ঝুলছে। এমনকি সালমানের ছোট ভাইকে অপহরণ করার মতো ভয়ংকর অপচেষ্টাও চালানো হয়েছিল বলে পরিবার সূত্রে বারবার অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা একটি মামলায় রাজসাক্ষী রিজভী স্বীকার করেছিলেন যে সামিরার সাথে ডনের অবৈধ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তৎকালীন সময়ে অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত বছরের বিশ অক্টোবর ঢাকা অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাটি অপমৃত্যুর মামলা থেকে সরাসরি একটি পূর্ণাঙ্গ হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করার ঐতিহাসিক নির্দেশ প্রদান করে। পরদিনই রমনা থানায় এগারো জনকে সুনির্দিষ্ট আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় অতীতে একাধিকবার আত্মহত্যার তত্ত্ব প্রচার করা হলেও পরিবারের নাজিরবিহীন লড়াইয়ের কারণে সত্য আজ উন্মোচনের পথে। সিআইডির এখন সবচেয়ে বড় ও প্রধান পরীক্ষা হলো ডনকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরোনো নথিপত্র, রিজভীর ১৬৪ ধারার জবানবন্দি, পিবিআইয়ের প্রতিবেদন এবং নতুন এজাহারের তথ্যের মধ্যে নিখুঁত মিল খুঁজে বের করা। ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তদন্তকারীরা জানার চেষ্টা করবেন ১৯৯৬ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান কোথায় ছিল, সালমানের সাথে তার শেষ যোগাযোগ ঠিক কখন হয়েছিল, সামিরা ও অন্যান্য আসামিদের সাথে তার সম্পর্কের প্রকৃতি কেমন ছিল এবং সেই আলোচিত বারো লাখ টাকার চুক্তির কোনো বাস্তব ভিত্তি বা সত্যতা ছিল কি না। ঘটনার দিন যারা ইস্কাটনের সেই বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন এবং সালমানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় সাথে ছিলেন, তাদের পুরোনো বক্তব্যও নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। এদিকে সন্তানের খুনিদের ফাঁসির দাবিতে দীর্ঘ তিন দশক ধরে রাজপথে লড়াই করে যাওয়া সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ডনের গ্রেপ্তারে আংশিক সন্তোষ প্রকাশ করলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ডনকে নিবিড় রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলেই কেবল হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ডদের আসল চেহারা দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হবে। আগামী ত্রিশ আগস্ট এই মামলার পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত দিন ধার্য করা হয়েছে এবং সেদিনই হয়তো জাতির সামনে উন্মোচিত হতে পারে বহু বছরের সেই অন্ধকার রাতের সবচেয়ে বড় ও অজানা সত্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত