প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় আঘাত হানার পর পেরিয়ে গেছে বেশ কিছু সময়, তবে এখনও কাটেনি প্রলয়ংকরী সেই বিপর্যয়ের রেশ। প্রকৃতির এক অপরিসীম ও নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দেশটির বিস্তীর্ণ জনপদ। গত সোমবার স্থানীয় সময় সকালে আঘাত হানা অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়াবহ এক ভূমিকম্পের তাণ্ডবে পুরো দেশজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোক ও চরম আতঙ্ক। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে সাত দশমিক চার মাত্রার ওই শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ধ্বংসলীলায় প্রাণহানির সংখ্যা ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে অন্তত দুইশ চল্লিশ জনে গিয়ে ঠেকেছে। শুধু তাই নয়, আকস্মিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর থেকে এখনও পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন শহর ও জনপদ থেকে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তরফ থেকে অত্যন্ত শঙ্কার সাথে জানানো হয়েছে। প্রিয়জনদের হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়া নিখোঁজ মানুষগুলোর পরিবার এখন চরম উৎকণ্ঠা ও কান্নায় দিন পার করছে।
ভূমিকম্পের কবলে পড়ে ধসে পড়া হাজার হাজার বহুতল ভবন এবং কংক্রিটের বড় বড় স্তূপের নিচে এখনও অসংখ্য মানুষ জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় আটকে পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের দ্রুত উদ্ধার করার জন্য এবং ধ্বংসস্তূপের গভীরে প্রাণের সন্ধান চালাতে মঙ্গলবার দিনভর এবং গভীর রাতেও বিন্দুমাত্র বিরতি না দিয়ে নিরলস ও সাহসী অভিযান চালিয়ে গেছেন দেশটির ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রস এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীরা। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে এক অবিচল ও মানবিক বার্তা, যেখানে তারা বারবার উচ্চারণ করছেন যে প্রতিটি সেকেন্ড ও প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত মূল্যবান। প্রকৃতির এই নির্মম ধ্বংসস্তূপের ভেতরে যদি সামান্যতম প্রাণের স্পন্দন বা ক্ষীণ আশার আলোও বেঁচে থাকে, তবে তা খুঁজে বের করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। উদ্ধারকারীদের এই অদম্য স্পৃহা এবং অক্লান্ত পরিশ্রম বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে এবং এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির মাঝেও এটি এক অন্যরকম মানবিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ঠিক সাতটা বেজে চৌত্রিশ মিনিটে, যখন পশ্চিম কলম্বিয়ার ভূগর্ভস্থ গভীর থেকে হঠাৎ করে এই প্রবল কম্পন পুরো অঞ্চলকে কাঁপিয়ে তোলে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ সহ্য করা কলম্বিয়ার এই চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হিসেবে ইতিমধ্যেই এটি চিহ্নিত হয়েছে। প্রকৃতির এই আচমকা আঘাতে সবচেয়ে বেশি এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কালি এবং পেরেইরা শহর দুটি। নিমেষেই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে শত শত বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট এবং হাজার হাজার কাঁচা ও পাকা ঘরবাড়ি। আকস্মিক এই বিপর্যয়ের ফলে যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সাথে মূল শহরের সংযোগকারী সেতু ও সড়ক ভেঙে পড়েছে এবং বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির মতো অত্যন্ত জরুরি নাগরিক সেবাগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে আরও বেশি দুরূহ করে তুলেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর অন্যতম কালিতে ধ্বংসের যে তাণ্ডবলীশা দেখা গেছে, তা যেকোনো মানুষকে শিহরিত করবে। তবে এই গভীর অন্ধকারের মাঝেও মাঝেমধ্যে কিছু আশার আলো উঁকি দিচ্ছে। ভূমিকম্পের প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও মঙ্গলবার ভোরে কালির একটি সম্পূর্ণ ধসে পড়া আটতলা ভবনের কংক্রিটের ভারী স্তূপের নিচ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবককে অলৌকিক উপায়ে জীবীত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন দমকলকর্মীরা। দীর্ঘ চব্বিশ ঘণ্টা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে থাকা ওই ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর চারপাশের মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়েন। দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সফল উদ্ধার অভিযানের একটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করা হয়, যা সারা বিশ্বে চরমভাবে প্রশংসিত হয়েছে। উদ্ধারকারী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই একটিমাত্র জীবন রক্ষা পাওয়ার ঘটনা পুরো টিমের মনোবল বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তারা আরও দ্বিগুণ শক্তিতে ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঠিক মাত্র কয়েক দিন আগেই গত শুক্রবার দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা। দেশের এমন এক গভীর সংকটের মুহূর্তে দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে গোটা দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং নিজে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ছুটে যান। সোমবার রাতেই তিনি সরাসরি কালিতে উপস্থিত হয়ে উদ্ধার কার্যক্রমের সার্বিক তদারকি করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নেন। প্রেসিডেন্টের দপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কালির আশপাশের ভালে দেল কাওকা বিভাগে একাই প্রায় পাঁচ হাজার আবাসিক বাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়ে গেছে এবং কেবল ওই অঞ্চলেই প্রায় এক শ আটাশি জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া পেরেইরা শহরের পরিস্থিতিও অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কালির প্রায় এক শ ত্রিশ মাইল উত্তরে অবস্থিত পাহাড়ি ও জনবহুল এই শহরটিতে অন্তত আটান্নটি বড় ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে এবং সেগুলোর নিচে বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শহরটিতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ষাট জনেরও বেশি মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসের পর গত আড়াই দশকে কলম্বিয়া এত বড় এবং প্রাণঘাতী কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়নি। সে সময় দেশটির কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের ছয় দশমিক দুই মাত্রার একটি ভূমিকম্পে এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর সেই স্মৃতি আবার তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দেশবাসীকে। এদিকে বর্তমান এই চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেন কোনো ধরনের লুটপাট, অরাজকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে না পারে, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ইতোমধ্যে এক হাজারেরও বেশি সশস্ত্র সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, উদ্ধার ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা এই মুহূর্তে প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। প্রকৃতির এই অপরিসীম ধ্বংসলীলার পর ঘুরে দাঁড়ানোর দীর্ঘ ও কঠিন লড়াই শুরু করেছে কলম্বিয়ার সাধারণ মানুষ, আর উদ্ধারকর্মীরা এখনো ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের মহৎ ও জীবনরক্ষাকারী অভিযান।