খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন: ব্যবসায়ীদের মনে হয়রানির আশঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৬ বার
খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন: ব্যবসায়ীদের মনে হয়রানির আশঙ্কা
প্রকাশ: ১২ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো রাস্তার পাশের ছোট খাবারের দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে সরকার এবার দেশের প্রতিটি খাদ্য ও পানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে এক সুশৃঙ্খল আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার একটি ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ—বিএফএসএ কর্তৃক জারিকৃত ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী এখন থেকে ছোট-বড় সব ধরনের খাদ্য ব্যবসায়ীকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন কিংবা লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। গত ১৬ জুলাই এই সংক্রান্ত প্রবিধানমালার গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
সরকারের এই নতুন প্রবিধান অনুযায়ী, যেকোনো রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী, ক্যাটারিং সেবাদাতা এমনকি রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি বা পেঁয়াজু বিক্রির মতো ক্ষুদ্রতম ব্যবসাকেও বিএফএসএ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। অন্যদিকে, শিশুখাদ্য, বিশেষায়িত রোগীদের খাবার, ফর্টিফায়েড বা পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, অর্গানিক পণ্য এবং জিনগত পরিবর্তন করা খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কঠোর নিয়মের অধীনে লাইসেন্স নিতে হবে। এছাড়া, ভোজ্যতেলের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও আমদানিকারক এবং বড় ধরনের খাদ্য মজুতকারী গুদাম ও হিমাগারগুলোকেও এই লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হয়েছে, যার জন্য ব্যবসায়ীদের এক হাজার থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়তন ভেদে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি পরিশোধ করতে হবে। সরকারের এই উদ্যোগ আপাতদৃষ্টিতে খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইতিবাচক মনে হলেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা নানা প্রশ্ন তুলছেন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা এমনিতেই পুঁজি স্বল্পতা এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে হিমশিম খাচ্ছেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ত এলাকায় দীর্ঘ দুই দশক ধরে ছোট দোকান চালিয়ে সংসার চালানো ব্যবসায়ীরা এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন যে, এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া তাদের সীমিত লাভের ওপর নতুন করে বাড়তি চাঁদা বা আমলাতান্ত্রিক হয়রানির বোঝা চাপাবে কি না। অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর প্রশাসনিক জটিলতা বা অনলাইন নিবন্ধন প্রক্রিয়ার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে, নিবন্ধন নিতে গিয়ে তারা যদি কোনো অসাধুচক্র বা দালালের খপ্পরে পড়েন, তবে সেই অর্থনৈতিক ক্ষতির দায়ভার কে নেবে? এই শঙ্কা কেবল কারওয়ান বাজারের মাসুদের একার নয়, বরং দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মুখে এখন একই প্রশ্ন—নিবন্ধন না নিলে কি তাদের দীর্ঘদিনের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে?
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ বলছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় পৌনে পাঁচ লাখেরও বেশি খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। এত বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ীকে লাইসেন্সের আওতায় আনার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিএফএসএর আছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষকরাও যথেষ্ট সন্দিহান। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান মনে করেন, কেবল জরিমানার ভয়ে বা কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে খাদ্যের মান উন্নত করা সম্ভব নয়। তিনি পোশাক শিল্পের মতো একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে ব্যবসায়ীদের সমিতির মাধ্যমে নিজস্ব তদারকির সুযোগ থাকবে এবং সরকার কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে। তাঁর মতে, বিদ্যমান অবস্থায় ১২টি সরকারি সংস্থা আলাদাভাবে নিয়মিত অভিযান চালানোর নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে। নতুন এই প্রবিধানমালার ফলে আরও একটি নতুন লাইসেন্স বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা পুরো খাতের পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলবে।
বেকারি ও কনফেকশনারি খাতের ব্যবসায়ীরাও একই সুর তুলেছেন। তাদের মতে, অটোমেটিক বড় ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে হাতে তৈরি রুটি-বিস্কুট বানানো ছোট বেকারিগুলোকেও এই প্রবিধানমালার আওতায় আনা হয়েছে। লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় যদি স্বচ্ছতা না থাকে এবং এর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ের অপচয় হয়, তবে ছোট ব্যবসায়ীরা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতার কাছে টিকতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীদের আরও বড় একটি অভিযোগ হলো, একই ব্যবসার জন্য বারবার ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদন নেওয়া অত্যন্ত অযৌক্তিক। ইতিমধ্যে বিএসটিআইসহ বিভিন্ন সংস্থার সনদ ও ছাড়পত্রের জন্য তাদের বড় অংকের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। এখন বিএফএসএর এই নতুন নিয়ম তাদের কাঁধে যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বারবার আশ্বস্ত করে বলছেন যে, এই প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক হওয়ার কারণে কোনো প্রকার দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। তাদের দাবি, একটি সুনির্দিষ্ট ডেটাবেজ ছাড়া দেশের খাদ্য ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া বা তাদের মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে সহায়তা করা অসম্ভব। বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ১৩ হাজার খাদ্য ব্যবসায়ীর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, নিবন্ধন ফি অত্যন্ত কম নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এটি কেবল শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ঘুষ-বাণিজ্য এড়াতে তারা বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন।
তথাপি, অভিজ্ঞ মহল মনে করে যে, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরেও অনেক ক্ষেত্রেই পাসপোর্ট বা বিআরটিএ-র মতো সেবায় সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়। সে ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের খাদ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই শঙ্কা অমূলক নয়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলেও তা যেন কোনোভাবেই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে না দাঁড়ায়। সমন্বিত পরিকল্পনা, স্বচ্ছ আইনি কাঠামো এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই কেবল এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করা সম্ভব। সরকারকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন খাদ্যের নিরাপত্তার নামে ব্যবসায়িক পরিবেশ অস্থির না হয় এবং অসাধু কর্মকর্তাদের হাতে যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই জিম্মি না হয়ে পড়েন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত