প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও মন্দার হাওয়া বইছে, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য এক অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক ও স্বস্তিদায়ক সংবাদ সামনে এসেছে। ইউরোপের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের সরকারি নীতি-নির্ধারণী ও পরিসংখ্যান বিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে এবং দেশটির বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক এক বাণিজ্য প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, বিগত এক বছরে ব্রিটিশ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং বহির্বিশ্বে তৈরি পোশাক খাতের শক্তিশালী অবস্থানকে আরও বেশি সুরক্ষিত ও প্রসারিত করতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করছে।
যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর বিজনেস অ্যান্ড ট্রেড কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাক্টশিটের বিস্তারিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক বা জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত হিসাব ধরে এক বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়সীমায় যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন দশমিক আট বিলিয়ন বা তিনশ আশি কোটি পাউন্ডে। আগের বছরের একই সময়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে, এই অঙ্কটি প্রায় পাঁচ কোটি পঞ্চাশ লাখ পাউন্ড বা পাঁচশো পাঁচ মিলিয়ন পাউন্ড বেশি। শতকরা হিসেবে এই বৃদ্ধির হার হলো পনেরো দশমিক এক শতাংশ। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই মন্দা এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারের মধ্যেও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের এই অর্জন দেশের রপ্তানি খাতের অদম্য গতিশীলতা এবং উৎপাদনশীলতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উক্ত সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার সার্বিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মোট পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চার দশমিক পাঁচ বিলিয়ন বা চারশ ৫০ কোটি পাউন্ডে গিয়ে ঠেকেছে। বিগত বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যানের সাথে হিসাব করলে দেখা যায় যে, এই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় বারো শতাংশ বা প্রায় আটচল্লিশ কোটি সত্তর লাখ পাউন্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা রপ্তানি হয়েছে তার মোট আর্থিক মূল্য ছিল তিনশ আশি কোটি পাউন্ড। বিপরীতে, একই সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে আমদানীকৃত পণ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র সত্তর কোটি পাউন্ড। দুই দেশের এই বাণিজ্য ব্যবধানের ফলে বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যে যুক্তরাজ্যের প্রায় তিনশ দশ কোটি পাউন্ডের একটি বিশাল বাণিজ্যঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিগত বছরে এই বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় দুইশ ষাট কোটি পাউন্ড। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, ব্রিটিশ বাজারের ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের নির্ভরতা এবং প্রভাব দিন দিন কতটা সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের এই বিশাল রপ্তানি আয়ের সিংহভাগজুড়ে রয়েছে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তথা ঐতিহ্যবাহী তৈরি পোশাক খাত। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের যেসব পণ্য নিয়মিত রপ্তানি হয়, তার মধ্যে তৈরি পোশাকের আধিপত্য ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় তিন দশমিক তিন বিলিয়ন বা তিনশ ত্রিশ কোটি পাউন্ডের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় পনেরো দশমিক পাঁচ শতাংশ বেশি। অর্থমূল্যে বিচার করলে দেখা যায় যে, কেবল তৈরি পোশাক খাত থেকেই রপ্তানি আয় প্রায় পঁয়তাল্লিশ কোটি পাউন্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে থাকে, তার প্রায় বিরানব্বই শতাংশই আসে এই তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। পোশাকের বাইরেও টেক্সটাইল ফেব্রিক, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ, তাজা মাছ, হিমায়িত সামুদ্রিক খাদ্য এবং মানসম্মত জুতা বা পাদুকা রপ্তানির ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশও যুক্তরাজ্য থেকে নির্দিষ্ট কিছু ভারী ও প্রযুক্তিগত পণ্য আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে শিল্পকারখানা ও উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত যান্ত্রিক ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সরঞ্জাম অন্যতম। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে যত পণ্য রপ্তানি করা হয়, তার অর্ধেকের বেশি বা প্রায় একান্ন দশমিক সাত শতাংশই হলো এই ধরনের ভারী শিল্প যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক মোটর এবং গবেষণামূলক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। ব্রিটিশ বাজারে বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যুক্তরাজ্যের মোট বাণিজ্য অংশীদারদের তালিকায় বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান বাহান্নতম স্থানে রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে পণ্য আমদানির বড় উৎসের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ছত্রিশতম এবং তাদের সামগ্রিক রপ্তানি বাজারের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান একাশিতম। দুই দেশের এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সামনের দিনগুলোতে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশা প্রকাশ করছেন।

উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগের চিত্রেও পারস্পরিক সম্পর্কের এক দারুণ মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের পরিমাণ বেশ সন্তোষজনক। দুই হাজার চব্বিশ সালের শেষ নাগাদ হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সঞ্চিত বা পুঞ্জীভূত এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় এক দশমিক এক বিলিয়ন বা একশ দশ কোটি পাউন্ড। আগের বছরের তুলনায় এই বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় চার কোটি পাউন্ড বা প্রায় তিন দশমিক আট শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সমসাময়িক সময়ে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের সঞ্চিত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় চুরাশি কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড। এটি মূলত কোনো এক বছরের একক নতুন বিনিয়োগ নয়, বরং বহু বছরের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের একটি সম্মিলিত রূপ। ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ মনে করেন যে, বাংলাদেশের জন্য ব্রিটিশ বাজার কেবল তৈরি পোশাকের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়, বরং আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে কৃষিপণ্য ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিধি বাড়াতে হবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক হাজারো ভ্যাট-নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের এই নিয়মিত বাণিজ্য ভবিষ্যতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।