ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, উত্তাল ছাত্র আন্দোলন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, উত্তাল ছাত্র আন্দোলন
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্য বর্তমানে এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। রাজ্যের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিগত ২০ দিন ধরে যে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, তা এখন এক তীব্র গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভ এখন কেবল শিক্ষা প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মূল আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বে না বলে সংকল্পবদ্ধ হাজার হাজার শিক্ষার্থী বর্তমানে তীব্র রোদে ও বৃষ্টিতে ভিজে তাদের অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, বিতর্কিত কয়েকটি পরীক্ষা বাতিল এবং সিবিআই অথবা ঝাড়খণ্ডের বাইরের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল গঠন করে নিরপেক্ষ তদন্তের যে দাবি শিক্ষার্থীরা তুলেছেন, তা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
আন্দোলনের দীর্ঘসূত্রতায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চা বা জেএলকেএম নেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো গত কয়েক দিন ধরে অনশনে থাকার ফলে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়াও আন্দোলনরত আরও বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অনশনকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আন্দোলনকারী ও সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে ইতিমধ্যে ছয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো কার্যকর সমাধান বেরিয়ে আসেনি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সরকার কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করছে না। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজছে। তবে শিক্ষার্থীদের অটল অবস্থান সরকারের জন্য এক বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোমবারের ঘটনাপ্রবাহ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সেদিন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বিধানসভা অভিযানের ডাক দিলে পুলিশের সঙ্গে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে, যার ফলে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পুলিশের এই দমনমূলক আচরণের প্রতিবাদে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি তাৎক্ষণিকভাবে রাজ্যজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দেয়। শাসকদল কংগ্রেস এবং বিজেপি একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলছে। বিজেপির অভিযোগ, রাজ্য সরকার শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত দাবি দমন করতে পুলিশি নির্যাতন চালাচ্ছে। পক্ষান্তরে, ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের দাবি, বিজেপি এই ছাত্র আন্দোলনকে তাদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছে এবং পরিস্থিতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘোলাটে করে তুলছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, যদি এক সপ্তাহের মধ্যে সিবিআই তদন্তের দাবি মেনে নেওয়া না হয়, তবে তিনি নিজেও অনশনে বসবেন।
মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ইতিমধ্যে কিছু আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। তিনি রাজ্যের নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং বিতর্কিত ১৪তম জেপিএসসি পরীক্ষা বাতিলের কথা জানিয়েছেন। তবে শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, কেবল পরীক্ষা বাতিল বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; বরং নিয়োগ পরীক্ষায় যে বিশাল অনিয়মের চক্র তৈরি হয়েছে, তার মূলোৎপাটন করতে হলে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের এই দাবির প্রতি সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, কারণ বেকারত্ব এবং চাকরির দুর্নীতির সমস্যাটি ঝাড়খণ্ডের তরুণ প্রজন্মের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা সরকারি চাকরির পদের আশায় বসে থাকা তরুণরা আজ যখন জালিয়াতি ও দুর্নীতির শিকার হয়, তখন তাদের স্বপ্নভঙ্গ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর সেই স্বপ্ন পুনরুদ্ধারের লড়াইয়েই আজকের এই উত্তপ্ত ঝাড়খণ্ড।
আন্দোলনের এই মানবিক দিকটি এখন সবার নজরে পড়ছে। প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীরা যখন তাদের দাবির সমর্থনে রাজপথে সমবেত হন, তখন কেবল তাদের ভবিষ্যতের চিন্তাই নয়, বরং ঝাড়খণ্ডের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের বার্তাও যেন ফুটে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থীই পরিবার ছেড়ে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ঝুঁকি নিয়ে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের অনেকেরই দাবি, কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি না করে তারা কেবল একটি স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রত্যাশা করেন। পুলিশের লাঠিচার্জ বা জলকামানের ভয় যে তাদের এই অদম্য স্পৃহা দমাতে পারেনি, তা গত ২০ দিনের কর্মসূচি দেখলেই বোঝা যায়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর এই টানাটানি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মূল দাবিকে আড়াল করে দিচ্ছে বলে অনেক সমাজ বিশ্লেষক মনে করেন। ঝাড়খণ্ডের এই পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিষ্পত্তি না করা যায়, তবে তা আরও বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ঝাড়খণ্ডের এই ছাত্র আন্দোলন কেবল চাকরি নিয়োগের দুর্নীতি নিয়ে নয়, বরং এটি একটি ব্যবস্থার প্রতি তরুণ প্রজন্মের আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। সরকার এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা অবসানের জন্য আলোচনার টেবিলে নমনীয়তা প্রদর্শন করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি রোধে কার্যকর ও স্থায়ী আইনি কাঠামো তৈরি করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি। ঝাড়খণ্ডের আকাশ থেকে এই অস্থিরতার কালো মেঘ কখন সরবে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, তরুণরা আজ আর কেবল আশ্বাসে তুষ্ট হতে রাজি নয়, তারা এখন কার্যকর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়। গণতন্ত্রের এই উত্তপ্ত ঝাড়খণ্ডে একটি শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানই এখন একমাত্র প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত