প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলাম শান্তি, সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবতার এক মহান বার্তা নিয়ে মানবজাতির কল্যাণে অবতীর্ণ হয়েছে। ইসলামের সুমহান শিক্ষা কেবল ইবাদত-বন্দেগির গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সামাজিক আচার-আচরণ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সমাজের দুর্বল অংশ, অসহায় মানুষ এবং নিজের অধীনে কর্মরত শ্রমিক, কর্মচারী কিংবা অধীনস্থদের প্রতি দয়া, ক্ষমা ও সদয় আচরণ প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত জোরালোভাবে। কারণ মানুষের জীবনের যেকোনো পর্যায়ে ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব পাওয়ার পর অনেক সময়ই মানুষ অহংকার বশে কিংবা অতিরিক্ত রাগের মাথায় তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বসেন। অথচ ইসলামে ক্ষমতার এই অপব্যবহার বা অধীনস্থদের ওপর যেকোনো ধরনের জুলুম ও নির্যাতন অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যার পরিণতি ইহকাল ও পরকালে অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক।
ইসলামী জীবন দর্শনের এই চিরন্তন সত্য ও সুমহান আদর্শের একটি উজ্জ্বল ও শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণিত হয়েছে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু মাসউদ বদরি (রা.)-এর জীবন থেকে। ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের ওপর মানুষের সাময়িক কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা যতই থাকুক না কেন, সর্বময় ক্ষমতার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা। হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত ওই ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে হজরত আবু মাসউদ বদরি (রা.) নিজেই জানান যে একদিন তিনি রাগের বশে তাঁর একজন দাসকে চাবুক দিয়ে প্রহার করছিলেন। অতিরিক্ত রাগ ও উত্তেজনার কারণে তাঁর পুরো বিবেক আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর পেছন দিক থেকে একটি পরিচিত ও অত্যন্ত স্নেহের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, যা তাঁকে ইশারা করে থামতে বলছিল। কিন্তু তীব্র ক্রোধের কারণে তিনি প্রথমে সেই কণ্ঠস্বর বা কথাগুলোর কোনো অর্থ বুঝতে পারেননি। এরপর যখন সেই মহান ব্যক্তিত্ব তাঁর আরও কাছাকাছি এসে পৌঁছলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে আর কেউ নন, স্বয়ং মানবতার মুক্তিরদূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

নবীজি (সা.) তাঁকে অত্যন্ত সুকৌশলে ও সতর্কবাণীর সুরে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন যে হে আবু মাসউদ, ভালো করে জেনে রাখো, এই পরাধীন মানুষটির ওপর তোমার যে পরিমাণ শারীরিক বা সামাজিক ক্ষমতা রয়েছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষমতা তোমার ওপর মহান আল্লাহ তাআলার রয়েছে। প্রিয় নবীর মুখ থেকে এই পবিত্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আবু মাসউদ (রা.)-এর অন্তরে প্রচণ্ড কম্পন সৃষ্টি হয়। তিনি বুঝতে পারেন যে ক্ষণস্থায়ী শক্তির মোহে পড়ে তিনি কতো বড় অন্যায় ও জুলুম করে ফেলেছেন। অনুতপ্ত আবু মাসউদ (রা.) সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ স্বীকার করে বলেন যে ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আজ থেকে এই গোলামকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও আজাদ করে দিলাম। তখন মহানবী (সা.) তাঁকে আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে তুমি যদি এই দাসকে মুক্ত না করতে, তবে পরকালের কঠিন বিচারে জাহান্নামের আগুন তোমাকে অবশ্যই গ্রাস করত বা স্পর্শ করত। সহিহ মুসলিমের চার হাজার তিনশত ছয় নম্বর এবং মুসনাদে আহমদের দুই হাজার দুইশত একান্ন নম্বর হাদিসে এই মর্মবাণী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে মানবজাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর কিছু শিক্ষণীয় বিষয় উন্মোচিত হয়। প্রথমত, অতিরিক্ত রাগ মানুষের যাবতীয় বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তিকে আচ্ছন্ন বা অন্ধ করে ফেলে। আবু মাসউদ (রা.)-এর মতো একজন মর্যাদাবান সাহাবিও রাগের বশে নিজের অধীনস্থ দাসের ওপর চাবুক চালিয়েছিলেন, যা নবীজির সতর্কবাণীর পর তাঁর ভুল ভেঙে দেয়। দ্বিতীয়ত, পার্থিব জীবনে মানুষের হাতে অর্পিত ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব হলো মূলত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট আমানত। পরিবার পরিচালনা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, রাষ্ট্র কিংবা সমাজ ব্যবস্থাপনায় যার হাতে যতটুকু ক্ষমতা বা নেতৃত্ব রয়েছে, তাকে সবসময় স্মরণ রাখতে হবে যে তাঁর ওপর চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহ বসে আছেন। তৃতীয়ত, অধীনস্থদের সঙ্গে সবসময় সদয়, মানবিক ও ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে। কেবল কোনো ভুলত্রুটি হয়েছে বলেই চাকর, শ্রমিক, অধীনস্থ কর্মচারী কিংবা নিজের সন্তান ও দুর্বল মানুষগুলোর ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার বা শারীরিক নির্যাতন চালানো কোনোভাবেই জায়েজ হতে পারে না।
চতুর্থত, সমাজের দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষের ওপর শক্তির অপব্যবহার করা অত্যন্ত বড় একটি অন্যায়। যে মানুষটি নিজের অধিকার রক্ষার জন্য প্রতিবাদ করতে অক্ষম কিংবা যিনি পুরোপুরি ক্ষমতাবানের ওপর নির্ভরশীল, তাঁর ওপর জুলুম করা আরও বেশি গুরুতর পাপ। পঞ্চমত, মানুষের জীবনে ভুল হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু নিজের ভুল বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই তা সংশোধন করে অনুতপ্ত হওয়া একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম প্রধান ভূষণ। হজরত আবু মাসউদ (রা.) নবীজির মৃদু তিরস্কার ও সতর্কবাণী শোনামাত্রই নিজের ভুল বুঝতে পেরে তা তাৎক্ষণিকভাবে শুধরে নিয়েছিলেন এবং দাসকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। ষষ্ঠত, মহান আল্লাহর শাস্তির ভয় এবং পরকালের জবাবদিহিতার অনুভূতি মানুষকে অন্যায় ও জুলুমের পথ থেকে বিরত রাখতে পারে। মজলুমের চোখের জল ও ফরিয়াদ আল্লাহর দরবারে সরাসরি পৌঁছে যায়, আর তাই ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে কারও ওপর অবিচার করার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা এই হাদিস থেকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

পরিশেষে বলা যায় যে মানুষের এই পার্থিব জীবনের ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব অত্যন্ত সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মহান আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা ও ইনসাফ চিরন্তন ও চিরস্থায়ী। আজকের দিনে যে ব্যক্তি সমাজ বা রাষ্ট্রে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার আসনে আসীন রয়েছেন কিংবা শক্তির অধিকারী হয়েছেন, তাকে আগামী দিনে প্রতিটি কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব আল্লাহর দরবারে দিতে হবে। দুর্বল ও অধীনস্থদের ওপর দমনপীড়ন কিংবা জুলুম চালিয়ে সাময়িকভাবে পার পাওয়া গেলেও আখিরাতের আদালতে তার কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তাই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইনসাফ, দয়া, ক্ষমা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে, যাতে কোনো অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাসে আমাদের ইহকাল ও পরকাল ধ্বংস হয়ে না যায়।