প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শান্তিপূর্ণ ও আধ্যাত্মিক নগরী হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত সিলেটে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সিলেট নগরের অভিজাত ও শান্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে একই পরিবারের স্বামী, স্ত্রী এবং তাঁদের গৃহপরিচারিকার গলাকাটা ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎপর্যের সঙ্গে চালানো তৎপরতা এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুনির্দিষ্ট ব্যবহারের ফলে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটনের দিকে এগোচ্ছে পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি ব্যবহৃত সেই ধারালো অস্ত্র বা ছুরিটি উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যা এই মামলার তদন্তে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঘটনার দিন সকালে রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে প্রবীণ বাসিন্দা আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগমের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় শোক ও ভীতির ছায়া নেমে আসে। ঘটনার পরপরই সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ছায়া তদন্ত শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজের নিখুঁত বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক সহায়তায় পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়া নামের এক যুবককে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে রায়নগর এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত বাবুল মিয়ার বয়স পঁয়ত্রিশ বছর এবং তিনি পেশায় একজন রঙের মিস্ত্রি ও কসাইয়ের কাজ করতেন।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের এক রোমহর্ষক বিবরণ বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, নিহত গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগমের সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃত বাবুল মিয়ার গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে একটি প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। অভিযুক্ত বাবুল এর আগে বিভিন্ন সময়ে নিহত আবদুস সাত্তারের বাসায় রঙের কাজ করার সুবাদে যাতায়াত করতেন। ঘটনার দিন সকালে বাবুল ওই বাসায় উপস্থিত হলে গৃহপরিচারিকা তাহমিনা ভেতর থেকে দরজা খুলে তাঁকে প্রবেশ করতে দেন। পরবর্তীতে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পর কোনো একটি তুচ্ছ বিষয় বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে তাহমিনার সঙ্গে তাঁর তীব্র কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই কথাকাটাকাটি হিংসাত্মক রূপ ধারণ করে এবং বাবুল সঙ্গে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাহমিনাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন। তাহমিনার আত্মচিৎকার ও কান্নার শব্দ শুনে পাশের কক্ষ থেকে এগিয়ে আসেন বয়োবৃদ্ধ সুরাইয়া বেগম ও আবদুস সাত্তার।
অমানবিক এই আক্রমণ থেকে প্রিয়জনদের বাঁচাতে এগিয়ে আসা বৃদ্ধ দম্পতিকেও রেহাই দেয়নি আক্রমণকারী। তাহমিনার পর একে একে সুরাইয়া বেগম এবং আবদুস সাত্তারকে অত্যন্ত নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় বাবুল। হত্যাকাণ্ডের পর কোনো ধরনের প্রমাণ না রেখে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বন্ধ ঘরের বারান্দার খোলা অংশ দিয়ে নেমে সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলে জানায় পুলিশ। এদিকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মূল অস্ত্রটি কোথায় ফেলা হয়েছে, সে বিষয়ে আটক বাবুল মিয়ার দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আজ বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশি অভিযান চালানো হয়। ঘটনাস্থলের ঠিক পাশের একটি পরিত্যক্ত খালি প্লট থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সেই রক্তমাখা ধারালো ছুরিটি উদ্ধার করে পুলিশ। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখা থেকে গণমাধ্যমের কাছে এই অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর একদিন পার হয়ে গেলেও সংবাদ লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি। এ বিষয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে নিহত আবদুস সাত্তারের একমাত্র ছেলে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তিনি ইতিমধ্যে দেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন এবং দেশে পৌঁছানোর পরেই নিহতের দাফন সম্পন্ন করা হবে এবং পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করা হবে। হত্যাকাণ্ডের শিকার এই পরিবারের স্বজনেরা মামলা করার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত আছে কি না, সে বিষয়ে আরও গভীর ও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হবে।

এদিকে এই ভয়াবহ ও রোমহর্ষক তিন খুনের ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মূল রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটনের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকে দ্রুত আইনের কঠোর আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মিতালি আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এই মানববন্ধনে এলাকার সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য প্রদান করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন যে সিলেট একটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ জনপদ এবং এই ধরনের রোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অতীতে কদাচিৎ ঘটেছে, যা পুরো নগরবাসীকে গভীরভাবে ব্যথিত ও আতঙ্কিত করেছে।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী স্থানীয় বিক্ষুব্ধ বাসিন্দারা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নানা যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, একজন সাধারণ রঙের মিস্ত্রি এককভাবে এত কম সময়ের মধ্যে অত্যন্ত সুকৌশলে তিনজন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে কীভাবে এত সহজে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারল, তা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য, পূর্বপরিকল্পিত শত্রুতা কিংবা অন্য কেউ সম্পৃক্ত থাকতে পারে বলে জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা। বিশেষ করে নিহত আবদুস সাত্তারের নগরের লামাবাজার এলাকায় মূল্যবান সম্পত্তি ও জায়গা-জমি রয়েছে বলে জানা গেছে এবং সেই সম্পত্তি সংক্রান্ত কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করেছে কি না, তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ও সর্বাত্মক তদন্তের মাধ্যমেই এই রহস্যের সম্পূর্ণ উন্মোচন ঘটবে বলে প্রত্যাশা করছেন দেশবাসী।