প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও কঠোর তৎপরতার পরেও কতিপয় অসাধু ব্যক্তির কারণে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াই। জনপ্রতিনিধিরা যখন সমাজের নীতিনিয়ন্ত্রক এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়ার কথা, ঠিক তখন তাঁদেরই কেউ কেউ যদি সমাজবিরোধী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েন, তবে তা পুরো দেশবাসীর জন্যই গভীর উদ্বেগের ও লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এমনই এক ন্যাক্কারজনক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলায়। যেখানে সমাজের আইনকানুন রক্ষার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের দুই নির্বাচিত সদস্যসহ মোট পাঁচজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে জুয়া খেলার সুনির্দিষ্ট অপরাধে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দায়িত্বশীল পদে থেকে জুয়ার আসরে বসে অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার এই ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত বিশ্বস্ত বিবরণে জানা গেছে যে, নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার আসমা ইউনিয়নের হরিয়াতলা গ্রামের পাকারাস্তা সংলগ্ন এলাকায় একটি বাজার রয়েছে যা স্থানীয়দের কাছে মেম্বার মার্কেট নামে পরিচিত। এই মার্কেটের ভেতরে অবস্থিত সাব্বিরের দোকান নামক একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র অত্যন্ত সুকৌশলে গোপন জুয়ার আসর পরিচালনা করে আসছিল। সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে রাতের আঁধারে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও এলাকার সচেতন মহলের মনে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংশয় ও ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। অবশেষ গত বুধবার দিবাগত গভীর রাতে পুলিশ প্রশাসনের কাছে গোপন সংবাদের মাধ্যমে এই অবৈধ জুয়ার আসর বসার খবর পৌঁছায়। সেই সংবাদের ভিত্তিতে বারহাট্টা থানার একদল সাহসী পুলিশ সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে ওই এলাকায় একটি ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেন এবং রাতের আঁধারে ওই দোকানটি ঘেরাও করে বসা জুয়ার আসর থেকে হাতেনাতে পাকড়াও করেন অভিযুক্তদের।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই আকস্মিক অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে মোট পাঁচজন ব্যক্তিকে অপরাধরত অবস্থায় গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় প্রকাশ করা হলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আটককৃতদের মধ্যে দুজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি যাঁরা স্থানীয় আসমা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান নির্বাচিত জনবহুল জনপ্রতিনিধি বা মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের সম্পূর্ণ পরিচয় পর্যালোচনা করে জানা গেছে যে, তাঁরা হলেন হরিয়াতলা গ্রামের নবীনেওয়াজের সুযোগ্য পুত্র এবং আসমা ইউনিয়ন পরিষদের সম্মানিত ইউপি মেম্বার লিটন মিয়া, যাঁর বয়স পঞ্চাশ বছর। এই জুয়ার আসরের মূল আয়োজক হিসেবে অভিযুক্ত মেম্বার মার্কেটের স্বত্বাধিকারী সাব্বির আহমেদ, যিনি এলাকার আলতাফুর রহমান আলতু মেম্বারের পুত্র এবং তাঁর বয়স বত্রিশ বছর। এ ছাড়াও এই চক্রের অন্য সদস্যরা হলেন উপেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বশর্মার পুত্র হিরেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বশর্মা, যাঁর বয়স বিয়াল্লিশ বছর এবং ছয়গাঁও এলাকার সামছুদ্দিনের পুত্র আসমা ইউনিয়ন পরিষদের অপর ইউপি মেম্বার এমদাদুল হক হীরা, যাঁর বয়স চল্লিশ বছর। এই তালিকায় আরও রয়েছেন চানফর আলীর পুত্র একদিল মিয়া, যাঁর বয়স আটত্রিশ বছর।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রাতের আঁধারে জুয়ার আসর থেকে আটক হওয়ার পর এই পাঁচ অভিযুক্তকে থানায় নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বারহাট্টা থানা পুলিশ ধৃত আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করে। জনবহুল একটি এলাকায় রাতের পর রাত জনপ্রতিনিধিদের এমন অনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করার দৃশ্য সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। যে মানুষগুলোর ওপর এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক কাজ তদারকি করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত ছিল, তাঁরাই যদি নিজ এলাকায় অপরাধের মূল হোতা হয়ে ওঠেন, তবে তা স্থানীয় সমাজব্যবস্থার নৈতিক অবক্ষয়কে অত্যন্ত নির্মমভাবে ফুটিয়ে তোলে। এলাকার সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং জড়িত জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত সাময়িক বরখাস্তসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি চম্পক দাম গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, বারহাট্টা থানা পুলিশ বর্তমান সময়ে যেকোনো ধরনের জুয়া, মাদক এবং সমাজধ্বংসী অপরাধের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের এই তৎপরতা কোনোভাবেই থমকে যাবে না। গ্রেপ্তারকৃত এই পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনে জুয়া প্রতিরোধ মামলা রুজু করা হয়েছে এবং তাঁদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ওসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি বর্তমান বছরের জন্য বারহাট্টা থানায় দায়ের করা জুয়া খেলাসংক্রান্ত প্রথম কোনো মামলা। তবে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এই ঝটিকা অভিযান ও টহল কেবল এখানেই থেমে থাকবে না, বরং এলাকার প্রতিটি প্রান্তে জুয়া ও মাদকের মূল উৎপাটন না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।