প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত অঙ্গনে নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি আকস্মিক সফর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মস্কো ও টোকিওর সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতস্থানে যেন নতুন করে নুনের ছিটা পড়ল। এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে দূরপ্রাচ্যের এক সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড—কুরিল দ্বীপপুঞ্জ। এই দ্বীপপুঞ্জের ইতুরূপ দ্বীপে ভ্লাদিমির পুতিনের সরাসরি উপস্থিতি উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে বরফ জমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাตรี জানা গেছে, কুরিল দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা তীব্র বিরোধের মাঝেই পুতিনের এই পা রাখা এক নতুন কূটনৈতিক ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই সফর নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে। খোদ জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই সফরকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জ দীর্ঘকাল ধরে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে বিরোধের মূল কাঁটা হয়ে বিদ্ধ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই দ্বীপগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং পরবর্তীতে সেখানে থাকা প্রায় ১৭ হাজার জাপানি নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে দেয়। সেই থেকে দ্বীপগুলো মস্কোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও টোকিও এগুলোকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ও ঐতিহাসিক ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে। জাপানিদের কাছে এই দ্বীপপুঞ্জ পরিচিত ‘নর্দার্ন টেরিটোরিজ’ বা উত্তরাঞ্চলীয় ভূখণ্ড নামে। অন্যদিকে রাশিয়ার কাছে এটি কুরিল দ্বীপপুঞ্জের একটি অত্যন্ত মূল্যবান অংশ। এই দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে তীব্র মতপার্থক্যের কারণে বিগত আট দশকেও দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারেনি। পুতিনের সাম্প্রতিক এই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দীর্ঘদিনের শীতলতাকেই কেবল স্মরণ করিয়ে দেয়নি, বরং পারস্পরিক আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।

রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলে সামরিক বাহিনীর একটি শক্তিশালী নৌমহড়া সফলভাবে পরিদর্শন ও শেষ করার পরপরই ভ্লাদিমির পুতিন ইতুরূপ দ্বীপের মাটিতে পা রাখেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত দৃশ্যপটে দেখা গেছে, রাশিয়ার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রপ্রধান অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভঙ্গিতে ইতুরূপের ইয়াসনি মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখছেন। কালো স্যুট পরিহিত পুতিনকে এ সময় সেখানকার স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মাছ ধরা এবং সামুদ্রিক প্রাণীর পরিযায়ী আচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফ করেন। শুধু তাই নয়, টেবিলের ওপর রাখা বিশাল আকৃতির টুনা এবং হ্যালিবাট মাছ নিজ চোখে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। এমনকি দ্বীপটির ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় মাছের সুস্বাদু ডিমও চেখে দেখেন রুশ প্রেসিডেন্ট। কূটনীতির হিমশীতল বার্তার বাইরেও পুতিনের এই সাধারণ মানুষের মতো স্থানীয় জীবনযাত্রা পরিদর্শনের দৃশ্য রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার লাভ করে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভিন্ন এক বার্তা বহন করে।
তবে ক্রেমলিনের এই উদযাপিত সফর জাপানের রাজনৈতিক মহলে চরম প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে পুতিনের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ধরনের সফর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং এটি মস্কোর প্রতি জাপানি নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবকে আরও নেতিবাচক করে তুলেছে। তাকাইচি আরও উল্লেখ করেন যে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ ঐতিহাসিকভাবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড অনুযায়ী জাপানের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ভূখণ্ড। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিৎসু মোতেগিও সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানান যে রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ সফরের বিরুদ্ধে টোকিও কঠোর কূটনৈতিক প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই ভূখণ্ডগত বিরোধ নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বহুবার বসেও দুই পক্ষ কোনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক এবং সামরিক কৌশলগত দিক থেকে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বিস্তার এবং আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়া গত এক দশকে এই দ্বীপগুলোতে সামরিক উপস্থিতি ও অবকাঠামোর ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে। ইতুরূপ দ্বীপে মস্কো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক সামরিক বিমানঘাঁটি স্থাপন করেছে, যেখান থেকে পুরো অঞ্চলের আকাশসীমার ওপর কড়া নজর রাখা হয়। এমনকি গত মাসেই চীন ও রাশিয়ার যৌথ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী অতিক্রম করে যৌথ টহল পরিচালনা করে। রাশিয়ার এই ধরনের নিয়মিত সামরিক মহড়া এবং কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়ে জাপান অতীতেও বহুবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাছাড়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর জাপান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মস্কোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে তলানিতে ঠেকেছে।

অতীতেও রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিরা এই বিতর্কিত দ্বীপগুলোতে সফর করায় টোকিও কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিল। রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দিমিত্রি মেদভেদেভ ও মিখাইল মিশুস্তিনের কুরিল সফর নিয়েও জাপান তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তবে খোদ ভ্লাদিমির পুতিন ব্যক্তিগতভাবে এই দ্বীপপুঞ্জে পা রাখায় প্রতিবাদের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক চাপের মুখেও রাশিয়া যে কুরিল দ্বীপপুঞ্জের ভূখণ্ডগত প্রশ্নে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ, পুতিনের এই সফর তারই একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত সংকেত। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জাপান সরকারও পিছু হঠতে রাজি নয়। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের এই ভূকৌশলগত বিরোধপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে মস্কো ও টোকিওর মধ্যকার এই শীতল যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন দীর্ঘমেয়াদে আরও তীব্র আকার ধারণ করবে বলেই আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।