এসডিজি বাস্তবায়নে উন্নয়ন কৌশলে সংস্কারের তাগিদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
এসডিজি বাস্তবায়নে উন্নয়ন কৌশলে সংস্কারের তাগিদ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে সব মহলের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে সফলভাবে সমাপ্ত হলো তিন দিনব্যাপী জাতীয় সম্মেলন। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে দেশের বরেণ্য নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক গত সোমবার শুভসূচনা হওয়া এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের যৌথ উদ্যোক্তা ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গর্ভন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট বা জিআইইউ এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ বা জিইডি। এছাড়া এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সক্রিয় যুক্ততা এই সম্মেলনকে আরও বেশি অর্থবহ ও অংশগ্রহণমূলক করে তুলেছিল। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তিত আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন কৌশলে সময়োপযোগী সংস্কার আনার জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়েছে এই মিলনমেলা থেকে।
সম্মাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে বলেন যে এসডিজি অর্জনের নির্ধারিত যাত্রাপথে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি এবং অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হলে প্রচলিত উন্নয়ন পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নের কৌশলগুলোতে আমূল ও প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে কেবল কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই লক্ষ্যগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য শতভাগ সঠিক তথ্য সংগ্রহ, অত্যন্ত কার্যকর ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ, পর্যাপ্ত অর্থায়নের নিশ্চয়তা বিধান এবং প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি বা মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও বেশি শক্তিশালী ও টেকসই করতে হলে দুর্নীতি রোধ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
সম্মেলনের সমাপনী দিনে অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনের মূল শিরোনাম ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সংস্কার ও উন্নয়নে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো এবং এসডিজি। এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন এবং পুরো অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সমাজকল্যাণমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান এখন ১১০তম স্থানে রয়েছে। অথচ এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য আমাদের হাতে সময় বাকি রয়েছে পাঁচ বছরেরও কম। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে আমাদের প্রথাগত কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে হবে এবং আরও অধিক গতিশীল ও সুশৃঙ্খলভাবে এগোতে হবে। অন্যদিকে, এই অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান যে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো যুগান্তকারী উদ্যোগগুলো অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন যে সরকার কেবল একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে কাজ করতে বদ্ধপরিকর।
সভাপতির বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন যে কেবল প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার কত হচ্ছে তা হিসাব করলেই চলবে না, বরং আমাদের অর্থনীতির মূল কাঠামো এবং সেই প্রবৃদ্ধির গুণগত মান কেমন তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সাম্প্রতিককালে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে দারিদ্র্য বিমোচনের মন্থর গতি এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে দেখা দিয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন। বর্তমান বাস্তবতার একটি নির্মম চিত্র তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন যে দেশের প্রতি তিনজন শিক্ষিত তরুণ বা যুবকের মধ্যে অন্তত একজন আজ বেকারত্বের অভিশাপের সঙ্গে লড়াই করছেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড না পাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও বঞ্চনার বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন একজন বক্তা। এর জবাবে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেন যে যারা এখনো এনআইডি কার্ড পাননি, তারা মূলত রাষ্ট্রের দেওয়া বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা ও নাগরিক সুবিধা থেকে সরাসরি বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে জাতীয় পরিচয়পত্র হলো যেকোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রথম এবং মৌলিক পদক্ষেপ, তাই সমাজ বা রাষ্ট্রের কাউকে পেছনে ফেলে নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়েই নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
এই প্রসঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান ব্যাখ্যা করে বলেন যে মূলত শৈশবে জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন না হওয়ার কারণেই পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এমন জটিল ও দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি হয়। তবে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তি চিরতরে লাঘব করতে খুব দ্রুতই সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জোরালো আশ্বাস প্রদান করেন। এদিকে সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশন শেষ হওয়ার পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের সরাসরি উত্তরে তিনি দাবি করেন যে সম্প্রতি চাল ও মাংসের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা হ্রাসের ফলেই গত জুলাই মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বিগত আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে মন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয় যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ দেখানো হলেও সাধারণ মানুষের কাছে তা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত বা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। কারণ হিসেবে বলা হয় যে জুলাই মাসের পুরো সময় জুড়েই দেশের খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে এবং বেশ চড়া। এমন বাস্তবতায় সরকার কীভাবে দাবি করছে যে মূল্যস্ফীতি কমেছে এবং এর প্রকৃত কারণ কী—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে সরকারিভাবে প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির তথ্যের সত্যতা তিনি নিজেই একাধিকবার অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যাচাই করে দেখেছেন। তিনি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের চাহিদার প্রধান দুটি উপাদান তথা চাল এবং মাংসের দাম বাজারে কিছুটা হলেও কমেছে। বারবার যাচাই-বাছাই করার পরেই এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সরকার কোনো অবস্থাতেই ভুল বা ভুয়া তথ্য দিচ্ছে না বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
সাংবাদিকদের আরও একটি প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো যদি শতভাগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে এসডিজির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য কোনো কঠিন বিষয় হবে না। তিন দিন ধরে চলা এই বর্ণাঢ্য ও ফলপ্রসূ জাতীয় সম্মেলনের আলোচনা ও সুপারিশগুলো দেশের আগামীর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ এবং দেশের আপামর সাধারণ মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি বৈষম্যহীন, সুখী ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয় এই সমাপনী আয়োজনে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত