চকরিয়ায় বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৪

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
চকরিয়ায় বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৪
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মহাসড়কের বুক চিরে চলা আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও কেড়ে নিল তাজা কিছু প্রাণ, স্তব্ধ করে দিল কয়েকটি পরিবারের চেনা পৃথিবীটা। ভারী বর্ষণ আর অন্ধকারের চাদরে মোড়ানো ভোরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়ন যেন এক নিদারুণ আর্তনাদে কেঁপে ওঠে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা একটি দ্রুতগামী যাত্রীবাহী এসি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী লোকাল লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন চারজন নিরীহ যাত্রী। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আরও পাঁচজন যাত্রী গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। ছুটির দিন কিংবা প্রাত্যহিক কাজের তাগিদে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষগুলোর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের কালো ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে মালুমঘাট ও কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চারপাশ, যা প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে যে ঘটনার দিন ভোর থেকেই চকরিয়ার খুটাখালী এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। প্রকৃতির এই চরম প্রতিকূল আবহাওয়া আর ভারি বৃষ্টির কারণে সড়কের দৃশ্যমানতাও ছিল বেশ সীমিত। ঠিক এমন সময়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা লাল সবুজ পরিবহনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যাত্রীবাহী বাসটি চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়াস্থ বায়তুল মামুর জামে মসজিদের সামনে পৌঁছায়। ঠিক একই সময়ে বিপরীত দিক অর্থাৎ ঈদগাঁও উপজেলা থেকে ছেড়ে আসা চকরিয়ামুখী যাত্রীবাহী লেগুনাটি নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিল। দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে লেগুনাটির ছাদ সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে উপড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটি একটি ছাঁট লোহায় পরিণত হয় এবং ভেতরে থাকা নয়জন যাত্রীর সবাই মারাত্মকভাবে জখম হয়ে রক্তবন্যা পরিস্থিতিতে পড়েন। ভোরের এই নিস্তব্ধতা ভেঙে চারপাশের মানুষের চিৎকার ও কান্নাকাটি এক বিভীষিকাময় পরিবেশের সৃষ্টি করে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই স্থানীয় এলাকাবাসী চরম মানবিকতার পরিচয় দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং উদ্ধারে অংশ নেন। পরে মালুমঘাট হাইওয়ে থানা পুলিশও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং স্থানীয়দের সহায়তায় রক্তাক্ত ও আহত যাত্রীদের দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে কাছের মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথম যাত্রীর মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেন চিকিৎসকরা। বাকি আটজন আহতের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একে একে আরও তিন জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। নিহতের এই সংখ্যা বাড়তে থাকায় শোকের মাতম আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বর্তমানে আহত অপর পাঁচজন যাত্রী কক্সবাজার সদর হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে জীবনের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন।
এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো হতভাগ্য চার যাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তারা হলেন চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সেগুন বাগিচা গ্রামের মৃত মতিউর রহমানের ছেলে মো. জসীম উদ্দিন, খুটাখালীর ফুলছড়িস্থ শিয়া পাড়ার মৃত মনজুর আলমের ছেলে মোহাম্মদ শাহেদ, খুটাখালীর নতুন অফিস এলাকার আমিনুল হকের ছেলে মো. জিয়াবুল হক এবং পার্শ্ববর্তী ঈদগাঁও উপজেলার পশ্চিম গজারিয়া এলাকার মৃত আবুল কাশেমের ছেলে মোহাম্মদ রফিক। এছাড়া আহতদের মধ্যে রয়েছেন খুটাখালী নতুন অফিস মাদরাসা পাড়ার আবদুল সামাদের ছেলে জিয়াবুল হক, খুটাখালীর মেদাকচ্ছপিয়া গ্রামের বদরুদ্দোজার ছেলে দেলোয়ার হোসেন, ঈদগাঁও উপজেলার নাপিতখালী এলাকার আলী মিয়ার ছেলে সৈয়দ আলম ও তাঁর ছেলে মোহাম্মদ সরোয়ার এবং কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার কিরনতলী গ্রামের রহমত করিমের ছেলে সৈয়দ করিম। একেকটি তরতাজা প্রাণের এভাবে ঝরে যাওয়ায় তাদের পরিবারগুলোতে এখন চলছে মাতম।
দুর্ঘটনার পরপরই মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। মালুমঘাট হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক মো. শামছুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান যে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে। পরে ক্রেন ব্যবহার করে মহাসড়ক থেকে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ি দুটিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়। তিনি আরও জানান যে এই মর্মান্তিক ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর নিহতদের মরদেহগুলো অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। বৃষ্টির দিনে অতিরিক্ত গতি, অসাবধানতা কিংবা দৃশ্যমানতার অভাব—কী কারণে এই ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল, যাতে আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত