প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করা অমর নায়ক সালমান শাহর প্রয়াণের দীর্ঘ তিন দশক অতিক্রান্ত হতে চললেও আজও থামেনি তাঁর মায়ের চোখের জল। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই মহানায়কের রহস্যজনক মৃত্যুর পর থেকে তাঁর মা নীলা চৌধুরীর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক তীব্র হাহাকার আর অন্তহীন বেদনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। সম্প্রতি এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে ছেলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া জীবনের শেষ কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নীলা চৌধুরী এমন কিছু অজানা ও হৃদয়বিদারক তথ্য প্রকাশ করেছেন, যা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে শোকে আচ্ছন্ন করে তোলে। ছেলের মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরেও সেই শোক जराমাত্র কমেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও বেশি গভীর ও মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে। একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ আর সন্তানের প্রতি অন্তহীন ভালোবাসার এই গল্প আজও বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের হৃদয়কে কাঁপিয়ে তোলে।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নীলা চৌধুরী ফিরে যান ১৯৯৬ সালের সেই অভিশপ্ত ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে, যেদিন ইমনের অর্থাৎ সালমান শাহর সঙ্গে তাঁর শেষবারের মতো কথা হয়েছিল। সেদিন তিনি তার ব্যস্ত পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটে তাদের দাদাবাড়িতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, যাতে কায়ক্লেশে ব্যস্ততা থেকে কিছুটা মুক্ত হয়ে ছেলে অন্তত দুই-তিন দিন বিশ্রাম নিতে পারে। কিন্তু কাজের প্রতি চরম দায়িত্বশীল ও প্রযোজকদের লগ্নি করা অর্থের কথা চিন্তা করে সালমান অত্যন্ত ব্যস্ততার অজুহাতে মাকে বলেছিলেন, ‘এত মানুষের লগ্নি আমার কাছে। বিশ্রাম তো দূরে থাক, আমার মরারও সময় নেই আম্মা।’ মায়ের কচি ইমনের সেই কথাটি যে মৃত্যুর সঙ্গে এত নিখুঁতভাবে মিলে যাবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। সালমান মাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে কাজ কিছুটা গুটিয়ে এনে তাঁরা একসঙ্গে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংকক ভ্রমণে যাবেন এবং এক মাস শুধুই বিশ্রাম নেবেন। কিন্তু সেই এক মাসের ভ্রমণ আর কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। যে ছেলে আগের দিন সকালেও বলছিল তার মরার সময় নেই, পরের দিন সকালে সেই চিরচেনা হাসিমুখের মানুষটির মৃতদেহ উদ্ধারের খবর মাকে জীবন্ত দগ্ধ করার সমতুল্য ছিল।

সালমান শাহর সঙ্গে তাঁর মায়ের সম্পর্ক কেবল তারকা ও মায়েদের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাদের সম্পর্ক ছিল পরম বন্ধুত্বের ও বিশ্বাসের। নীলা চৌধুরী জানান যে সালমান তাঁর জীবনের প্রায় প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় অকপটে মায়ের সঙ্গে শেয়ার করতেন। কে তাঁর শুটিংয়ে আসছে, কোন পরিচালকের সঙ্গে নতুন কাজ হচ্ছে কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের না বলা কথা—সবকিছুই মায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছাত। যখনই সালমান মানসিকভাবে অস্থির থাকতেন বা কোনো কারণে ভালো থাকতেন না, তখনই তিনি মায়ের কাছে ছুটে আসতেন। একবার সালমানের হাত ও পিঠে কামড়ের দাগ দেখতে পেয়ে মা যখন ব্যাকুল হয়ে কারণ জানতে চেয়েছিলেন, তখন সালমান শিশুর মতো সরল মনে জানিয়েছিলেন যে তাঁর তৎকালীন স্ত্রী সামিরা তাকে কীভাবে নানাভাবে হয়রানি করতেন এবং সংসারে তাকে মানসিক অশান্তিতে রাখতেন। শুটিংয়ের বর্ণনায় নীলা চৌধুরী স্মরণ করেন যে তাঁর ছেলে কতটা বিনয়ী ও পরোপকারী ছিলেন। কোনো দিন জুনিয়র আর্টিস্ট বা এক্সট্রা শিল্পীদের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে তিনি কোনো ভেদাভেদ করতেন না। গরিব ও অনাহারী কলাকুশলীদের নিজে খাবার ও কাজের ব্যবস্থা করে দিতেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না, যা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় তুমুল জনপ্রিয়তার শিখরে অবস্থান করার কারণে সালমানের ব্যস্ততা এতটাই আকাশছোঁয়া ছিল যে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার ফুরসতও তাঁর ছিল না। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া কিংবা নিজের জন্য প্রয়োজনীয় শপিং করার সুযোগও পেতেন না তিনি। সেই ব্যস্ততার দিনে মা নিজেই ছেলের পছন্দের কথা মাথায় রেখে জামাকাপড় কিনে আনতেন, কারণ মায়ের সঙ্গে ইমনের পছন্দের রুচি ছিল অসাধারণ মিল। অথচ সেই ভালোবাসার সন্তানটিকে অল্প বয়সে এভাবে হারিয়ে ফেলা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না এই মা। সালমানের মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও লন্ডনের নিঃসঙ্গ বাসাবাড়িতে কিংবা দেশের মাটিতে একাকী মুহূর্তে নীলা চৌধুরীর চোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্যও এক হয় না। ছেলের স্মৃতিবিজড়িত চার ভরি ওজনের একটি সোনার চেইন তিনি আজীবন নিজের কাছে পরম যত্নে আগলে রেখেছেন, যা তাঁকে ইমনের শারীরিক স্পর্শের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইমনের স্মৃতি, পুরোনো ছবি আর মায়ের না বলা হাজারো আর্তনাদ নিয়েই আজ তাঁর এই একাকী ও দীর্ঘ জীবন যাত্রা।

এদিকে সালমান শাহর মৃত্যুর দীর্ঘ ২৯ বছর পর এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আইনি লড়াই ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর আদালতের নির্দেশে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই চাঞ্চল্যকর মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, খলঅভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রধান আসামি ডন আটকের পর এই হত্যা মামলা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি সিআইডির নিবিড় তদন্তের অধীনে রয়েছে এবং আগামী ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে। নীলা চৌধুরী দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়েছেন যে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কেবল তাঁর একমাত্র পুত্র হত্যার ন্যায়বিচার দেখতে চান। কোনো অপরাধী যেন শাস্তি এড়াতে পালিয়ে যেতে না পারে, সেই প্রত্যাশা নিয়েই তিনি আজও বেঁচে আছেন এবং লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।