ভোমরা বন্দরে কমছে বাণিজ্য, বাড়ছে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার
ভোমরা বন্দরে কমছে বাণিজ্য, বাড়ছে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য এখন অনেকটাই কমে গেছে। ভারত থেকে পণ্যবাহী ট্রাকের আগমন কমেছে, কমেছে রপ্তানির পরিমাণও। ফলে বন্দরের বিভিন্ন কাজে যুক্ত শ্রমিকদের অনেককে দিনের বড় একটি সময় কাজের অপেক্ষায় কাটাতে হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরাও বলছেন, বাণিজ্যের গতি কমে যাওয়ায় তাঁদের ওপর চাপ বাড়ছে।

সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভোমরা স্থলবন্দর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর। সীমান্তের ওপারে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা স্থলবন্দর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই বন্দরটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রাকের আসা-যাওয়া, পণ্য খালাস, পরিবহন ও কাস্টমসের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে এখানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ব্যস্ততার চিত্রে পরিবর্তন এসেছে। বন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কাজের অপেক্ষায় বসে থাকা শ্রমিকদের অনেকেই বলছেন, আগের তুলনায় এখন কাজের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বন্দরের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের একজন জানান, আগে নিয়মিত কাজ পাওয়া গেলেও বর্তমানে অনেক দিন পর্যাপ্ত কাজ থাকে না। পণ্য কম আসায় শ্রমিকদের আয়ও কমে গেছে। সংসারের খরচ মেটাতে অনেকে অন্য জায়গায় কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছেন। শুধু শ্রমিক নয়, বন্দরকেন্দ্রিক পরিবহন, পণ্য খালাস, কাগজপত্রের কাজ এবং বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষও আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব অনুভব করছেন।

ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের ভাষ্য, কিছু সময় আগে বন্দরের ব্যবসায়িক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। এতে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান কমেছে। তাঁদের মতে, বন্দর দিয়ে নানা ধরনের পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বাণিজ্যের এই মন্দার চিত্র সরকারি রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভোমরা কাস্টম হাউসের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আদায় হয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা। এই গতিতে রাজস্ব আদায় অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এর আগের অর্থবছরের পরিসংখ্যানও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোমরা কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যের তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ৯৫১ কোটি টাকা।

শুধু রাজস্ব নয়, বন্দরের পণ্য আমদানির পরিমাণও কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভোমরা বন্দর দিয়ে প্রায় ২০ লাখ ৮২ হাজার ৭২২ টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। পরের অর্থবছরে সেই পরিমাণ কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭ টনে। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে ১ লাখ ৯ হাজার ৬৭৫ টন।

রপ্তানি খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোমরা বন্দর দিয়ে ১৯ হাজার ৮৯টি ট্রাকে ভারতে প্রায় ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯৯ টন পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এসব পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।

এর আগের অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ লাখ ৬ হাজার টন। ওই সময় রপ্তানি আয় হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৪০৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে প্রায় ১০ লাখ ২৫ হাজার ৯০১ টন। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে আসছে বন্দর অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। ভারী পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য পর্যাপ্ত ক্রেন না থাকা, পর্যাপ্ত ইয়ার্ড সুবিধার অভাব এবং আধুনিক গুদামব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

সাতক্ষীরার ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, শুধু বন্দর থাকলেই বাণিজ্য বাড়ে না। পণ্য দ্রুত খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য আধুনিক অবকাঠামো প্রয়োজন। কোনো একটি পর্যায়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। এতে ব্যবসায়ীরা বিকল্প বন্দর ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আরেকটি অভিযোগ, ভারত থেকে আমদানি করা কিছু কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য কমে যাওয়ায় আমদানিকারকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পণ্য আমদানির পর বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়া গেলে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হয়। ফলে নতুন করে আমদানির ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহও কমে যায়।

ভোমরা বন্দরের সঙ্গে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা স্থলবন্দরের সরাসরি যোগাযোগ থাকলেও দুই দেশের সীমান্তবাণিজ্যে অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বন্দর ব্যবহারের সুবিধা যত বাড়ানো যাবে, তত দ্রুত পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে এবং ব্যবসার ব্যয় কমবে। এতে নতুন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদেরও আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।

তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধান এবং সেবার মান উন্নত করতে তারা কাজ করছে। পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে হয়রানি কমানো, কার্যক্রম দ্রুত করা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবির কথা শোনা হয়েছে। যৌক্তিক দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কাস্টমস কার্যক্রমকে আরও ব্যবসাবান্ধব করার পাশাপাশি পণ্য খালাসের সময় কমিয়ে আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ভোমরা স্থলবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয় নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বন্দরের কার্যক্রম কমে গেলে সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের আয়ে। এরপর পরিবহন, পণ্য খালাস, গুদাম, সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসা, স্থানীয় বাজার ও অন্যান্য সেবাখাতেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।

একজন শ্রমিকের কাছে বন্দরের প্রতিটি ট্রাক শুধু একটি পণ্যবাহী যান নয়; সেটি দিনের আয় নিশ্চিত করার একটি সুযোগ। তাই ট্রাকের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে অনেক পরিবারের আয় কমে যাওয়া। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে স্থানীয় শ্রমবাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে।

ভোমরা স্থলবন্দরের সম্ভাবনা অবশ্য কম নয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য এই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, দ্রুত কাস্টমস সেবা, পর্যাপ্ত ইয়ার্ড ও গুদাম সুবিধা এবং আধুনিক পণ্য ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বাণিজ্যের পরিমাণ আবার বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের প্রত্যাশা, সমস্যাগুলো শুধু আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কারণ বন্দর যত বেশি সচল থাকবে, তত বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে, ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের সুযোগও বাড়বে।

ভোমরা বন্দরের বর্তমান চিত্র তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—শুধু আমদানি-রপ্তানির সুযোগ থাকলেই বাণিজ্য বাড়ে না; প্রয়োজন সময়োপযোগী অবকাঠামো, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। এসব জায়গায় কার্যকর উন্নয়ন করা গেলে ভোমরা আবারও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত