প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও গবেষণার কেন্দ্র। শিক্ষকরা সেখানে শুধু পাঠদান করেন না; শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা বা গোপন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত আচরণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মূল্যবোধ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষকসমাজের অবদান গভীর ও গৌরবময়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু শিক্ষক, অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী দেশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রাণ দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের শিকারদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ দেশের বহু শিক্ষাবিদ ছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, একজন শিক্ষক সংকটের সময়ে জাতির পাশে দাঁড়ানোর কত বড় দায়িত্ব বহন করেন।
এই ঐতিহ্যের বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক একটি টেলিগ্রামভিত্তিক গোপন গ্রুপের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের নামও এ অভিযোগের সঙ্গে উঠে এসেছে। বিষয়টি যাচাই করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
তবে এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। একটি গোপন অনলাইন গ্রুপে থাকা, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করা কিংবা সরকারের সমালোচনা করা নিজেই রাষ্ট্রদ্রোহের প্রমাণ নয়। রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড, উদ্দেশ্য, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে রাজনৈতিক মতামত রাখার অধিকারও কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া যায় না। কিন্তু সেই মতপ্রকাশ যদি আইন ভঙ্গ, সহিংসতা উসকে দেওয়া, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন করা বা কোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই আইনের মুখোমুখি হতে হবে। একই নিয়ম শিক্ষক, রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা সাধারণ নাগরিক—সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত রাজনীতিকীকরণ। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ অনেক সময় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় যদি দলীয় প্রভাবের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিক্ষা ও গবেষণার।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নেয় না; তারা আচরণ, যুক্তি, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধও শেখে। তাই কোনো শিক্ষক যদি সত্যিই অপরাধমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, তার প্রভাব শিক্ষাঙ্গনের বাইরেও পড়তে পারে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো নিরপরাধ শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হলেও শিক্ষাঙ্গনে একই ধরনের ভয় ও অবিশ্বাস তৈরি হবে।
এ কারণেই বর্তমান অভিযোগের তদন্ত হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর। কারা ওই গ্রুপে ছিলেন, তাদের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল, তারা কী ধরনের বার্তা বা কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন এবং সেগুলো আইনত অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্ত কমিটির উচিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে প্রাথমিক সূত্র হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য নথি যাচাই করা। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। এতে একদিকে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানির সম্ভাবনাও কমবে।
যদি তদন্তে কোনো শিক্ষক সত্যিই রাষ্ট্রবিরোধী বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শুধু শিক্ষক হওয়ার কারণে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। আবার শিক্ষক হওয়ার কারণে কাউকে অতিরিক্ত শাস্তিও দেওয়া উচিত নয়। অপরাধের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় নিয়োগ ও প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি কমানো জরুরি। শিক্ষক নিয়োগে গবেষণা, একাডেমিক যোগ্যতা, দক্ষতা ও নৈতিক মানদণ্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা—দুটিই গণতান্ত্রিক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ। একটিকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটিকে ধ্বংস করা যাবে না। শিক্ষকরা সরকারের সমালোচনা করতে পারবেন, রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতে পারবেন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতির বিরোধিতা করতে পারবেন। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সীমা যেখানে আইনভঙ্গ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে পৌঁছায়, সেখানে আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজের ঐতিহাসিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন দলীয় আনুগত্যের বদলে জ্ঞান, গবেষণা, নৈতিকতা ও পেশাগত দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শিক্ষকের পোশাক কোনো রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঢাল হতে পারে না। একইভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও শিক্ষকের স্বাধীন মতপ্রকাশ দমনের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।
বর্তমানে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার। তাই গুজব, রাজনৈতিক প্রচারণা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তথ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভর করাই হবে দায়িত্বশীল পথ।
শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র নয়, জ্ঞান ও যুক্তির মুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য। অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে; আর অভিযোগ মিথ্যা হলে নির্দোষদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এই ভারসাম্যই পারে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকসমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখতে।