প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিল গেটসের মেয়ে ফিবি গেটসের প্রতিষ্ঠিত এআই-চালিত শপিং স্টার্টআপ ‘ফিয়া’কে ঘিরে ওঠা ‘কুকি স্টাফিং’–এর অভিযোগ নতুন করে আইনি বিতর্ক তৈরি করেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফিবি গেটস ও তার প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা এবং দেওয়ানি মামলার মুখে পড়তে হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তবে অভিযোগের ভিত্তিতে ফিবি গেটসের সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হওয়ার আশঙ্কা বাস্তবে তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ফেডারেল ওয়্যার জালিয়াতির অভিযোগে সর্বোচ্চ দুই দশকের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও প্রসিকিউটরদের আগে প্রমাণ করতে হবে যে ফিবি গেটস জেনেশুনে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন।
সাইবার ল’ ফার্মের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার স্টার ক্যাশম্যান বলেন, ওয়্যার জালিয়াতির অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল কোনো ভুল বা অসতর্কতা যথেষ্ট নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে অর্থ আত্মসাতের একটি স্কিমে অংশ নিতে হয়েছে—এমন প্রমাণ প্রয়োজন।
নিউ ইয়র্ক পোস্টকে ক্যাশম্যান বলেন, এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে আর্থিক ক্ষতি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষগুলো কমিশন, চুক্তি, ব্যবসায়িক সম্পর্ক, গোপনীয়তা এবং ভোক্তা-অধিকারসংক্রান্ত বিষয়েও দেওয়ানি মামলা করতে পারে।
ফিবি গেটস মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের ২৩ বছর বয়সী মেয়ে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সোফিয়া কিয়ানির সঙ্গে তিনি ‘ফিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাদের কনজ্যুমার অ্যাপ ও ব্রাউজার এক্সটেনশন চালু করে।
সম্প্রতি ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ফিয়ার ব্রাউজার এক্সটেনশন ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাফিলিয়েট ট্র্যাকিং কুকি বসিয়ে দিত। এমনকি ব্যবহারকারী কোনো পণ্য না কিনলেও ফিয়া সংশ্লিষ্ট বিক্রির কৃতিত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করত বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রযুক্তি ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে এ ধরনের পদ্ধতিকে সাধারণত ‘কুকি স্টাফিং’ বলা হয়।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই কর্মকাণ্ডের ফলে নাইকি, নর্ডস্ট্রম ও গ্যাপের মতো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব কোম্পানি এখনো প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
প্রতিবেদনে ফিয়ার অভ্যন্তরীণ স্ল্যাক বার্তা ও সোর্স কোডের উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, জনসমক্ষে বিষয়টি প্রকাশের কয়েক মাস আগেই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতারা স্বয়ংক্রিয় কুকি-প্লেসমেন্ট ফিচার সম্পর্কে জানতেন।
তবে ফিয়া ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে ফিবি গেটস বা ফিয়ার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞ স্টার ক্যাশম্যানও সতর্ক করে বলেছেন, কোনো কর্মকাণ্ড উদ্দেশ্যমূলক হলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফৌজদারি মামলা বা বিচার প্রক্রিয়ায় পরিণত হয় না। বিশেষ করে পরিচ্ছন্ন অতীত থাকা একজন তরুণ উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে প্রথম অপরাধেই সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া অত্যন্ত বিরল।
তবে অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে ফিবি গেটস ও তার কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ব্যবস্থা। সাধারণত কোনো ক্রেতা অ্যাফিলিয়েটের দেওয়া লিংক বা কুপন ব্যবহার করে পণ্য কিনলে ট্র্যাকিং কুকির মাধ্যমে সেই অ্যাফিলিয়েটকে শনাক্ত করা হয় এবং বিক্রির জন্য কমিশন দেওয়া হয়।
কিন্তু ‘কুকি স্টাফিং’ এই ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। এতে কোনো অ্যাফিলিয়েট এমন বিক্রির কমিশনও দাবি করতে পারে, যার ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে তার কোনো ভূমিকা ছিল না।
দীর্ঘদিনের বিজ্ঞাপন গবেষক বেন এডেলম্যান ফিয়ার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করেছেন। তার মতে, ব্রাউজার এক্সটেনশনের মতো ক্লায়েন্ট-সাইড সফটওয়্যার ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর প্রকৃত সম্পৃক্ততা ছাড়াই অ্যাফিলিয়েট লিংক সক্রিয় করা বা কুকি বসানোর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
এডেলম্যানের ভাষায়, এর ফলে অ্যাফিলিয়েটের আয় বাড়লেও বিক্রেতা বা মার্চেন্টদের খরচ বেড়ে যেতে পারে। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে পারফরম্যান্স-মার্কেটিং ব্যবস্থার মৌলিক নিয়মের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন।
পারফরম্যান্স-মার্কেটিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অ্যাটর্নি রিচার্ড নিউম্যানও জানিয়েছেন, অ্যাফিলিয়েট চুক্তিতে সাধারণত কুকি স্টাফিং নিষিদ্ধ থাকে। কোনো অ্যাফিলিয়েট এমন শর্ত ভঙ্গ করলে তার কমিশন বাতিল হতে পারে।
নিউম্যানের মতে, এ ধরনের বিরোধ অনেক সময় ফৌজদারি মামলার পরিবর্তে বেসরকারি পক্ষগুলোর মধ্যকার চুক্তিভিত্তিক বিরোধ হিসেবেই নিষ্পত্তি হয়।
এদিকে বিতর্কিত ফিচারগুলো বন্ধ করার পর ফিয়ার গড় দৈনিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কথাও ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, আয় প্রায় ৮০ হাজার ডলার থেকে নেমে ১০ হাজার থেকে ২৮ হাজার ডলারের মধ্যে চলে আসে। তবে ফিয়া বলেছে, তাদের অধিকাংশ মনিটাইজেশন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার কারণেই এই পতন ঘটেছে।
ফলে ফিবি গেটসের প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপকে ঘিরে বিতর্ক এখন প্রযুক্তি, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এবং আইনি দায়—তিন ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা মামলায় গড়াবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।