প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের একটি পরীক্ষামূলক ম্যাগলেভ ট্রেন মাত্র ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে স্থির অবস্থা থেকে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। অতি উচ্চগতির পরিবহন প্রযুক্তির গবেষণায় এই সাফল্যকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।
হুবেই প্রদেশের দুংহু ল্যাবরেটরির মাত্র এক কিলোমিটার দীর্ঘ পরীক্ষামূলক ট্র্যাকে এই পরীক্ষা চালানো হয়। প্রায় ১ দশমিক ১ টন ওজনের ট্রেনটি স্থির অবস্থা থেকে মাত্র ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছায়।
ম্যাগলেভ প্রযুক্তিতে ট্রেন চৌম্বক শক্তির সাহায্যে রেললাইনের ওপর ভেসে থাকে। ফলে প্রচলিত ট্রেনের মতো চাকা ও রেলের মধ্যে সরাসরি ঘর্ষণ তৈরি হয় না। ট্র্যাকের কয়েল থেকে সৃষ্ট চৌম্বকীয় তরঙ্গ ট্রেনকে সামনে এগিয়ে নেয়।
গবেষকদের জন্য শুধু দ্রুত গতি অর্জন করাই এই পরীক্ষার লক্ষ্য ছিল না। এত অল্প সময়ে বিপুল গতিতে পৌঁছানোর পর ট্রেনটিকে নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ এবং থামানোও ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। গবেষকদের দাবি, ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতি অর্জনের পর ট্রেনটি মাত্র ২০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে নিয়ন্ত্রিতভাবে থামতে সক্ষম হয়েছে।
গত ছয় মাসের মধ্যে একই পরীক্ষামূলক ট্রেনের এটি তৃতীয় গতির রেকর্ড। ২০২৫ সালের জুনে প্রথম পরীক্ষায় ট্রেনটি সাত সেকেন্ডে ঘণ্টায় প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার গতি অর্জন করেছিল। এরপর পরবর্তী পরীক্ষায় প্রায় ৭০০ কিলোমিটার এবং ৭৯৮ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছে আগের রেকর্ডগুলো ভেঙে দেয়।
চীনের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎ সরবরাহ, তড়িৎ-চৌম্বকীয় প্রপালশন, উচ্চগতির লেভিটেশন নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি ব্রেকিং প্রযুক্তির সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়েছে।
ম্যাগলেভ বা চৌম্বকীয় ভাসমান ট্রেনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ঘর্ষণ কম থাকায় প্রচলিত রেলব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি গতিতে চলার সম্ভাবনা। তবে পরীক্ষাগারে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতি অর্জন করা আর যাত্রী নিয়ে নিয়মিত এই গতিতে চলাচল করা এক বিষয় নয়।
বর্তমানে চীন ও জাপানে চলাচলকারী ম্যাগলেভ ট্রেনগুলোর গতি এর তুলনায় অনেক কম। চীনের বাণিজ্যিক ম্যাগলেভ ট্রেনগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন ট্রেন প্রায় ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করে।
অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তি নিয়ে চীনের অন্যান্য গবেষণাগারেও কাজ চলছে। চীনের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির গবেষকেরা এক পরীক্ষায় মাত্র দুই সেকেন্ডে একটি ট্রেনকে ঘণ্টায় প্রায় ৬৯৭ কিলোমিটার গতিতে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে এসব প্রযুক্তি এখনো সাধারণ যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত নয়। অতিরিক্ত গতির কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা, শক্তিশালী অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহ, জরুরি ব্রেকিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ দূরত্বে নিখুঁত ট্র্যাক নির্মাণ—সবই বড় চ্যালেঞ্জ।
গবেষকদের ধারণা, এই প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতে শুধু যাত্রীবাহী ট্রেনেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। অতি দ্রুতগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তির মূল নীতিগুলো রকেট ও যুদ্ধবিমান উৎক্ষেপণব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
একই সঙ্গে স্বল্পচাপ বা প্রায় বায়ুশূন্য টিউবের মধ্যে ম্যাগলেভ ট্রেন চালানোর প্রযুক্তি নিয়েও চীনা বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। এ ধরনের ব্যবস্থা সফল হলে বায়ুর প্রতিরোধ আরও কমিয়ে অতি উচ্চগতির পরিবহন ব্যবস্থা তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে বাণিজ্যিক বাস্তবায়নের আগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দীর্ঘ দূরত্বের বিশেষ ট্র্যাক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, শক্তি ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।
চীনের সর্বশেষ পরীক্ষাটি তাই সরাসরি ৮০০ কিলোমিটার গতির যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর ঘোষণা নয়; বরং ভবিষ্যতের অতি উচ্চগতির পরিবহন প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ, প্রপালশন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।