অতিবৃষ্টিতে ফের তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম, দুর্ভোগে নগরবাসী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৬ বার
অতিবৃষ্টিতে ফের তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম, দুর্ভোগে নগরবাসী

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অতিভারী বৃষ্টিতে আবারও জলাবদ্ধতায় ডুবেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা। সোমবার সকাল থেকে টানা বৃষ্টিতে নগরীর নিচু সড়ক ও বসতবাড়ির আশপাশে পানি জমে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও তারও বেশি পানি জমে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পথচারীদের অনেককেই পানি পেরিয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা ইসমাইল ভূইয়ার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি দ্রুত জমে যায়। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সোমবার দিনজুড়েও চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর পাহাড়ি ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বসবাসকারী মানুষদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

সোমবার সকালে নগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি জমে যায়। অনেক সড়কে যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করতে পারেনি। কোথাও কোথাও পানি সড়কের ওপর উঠে যাওয়ায় পথচারীদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রধান সড়কের পাশাপাশি বিভিন্ন আবাসিক এলাকার গলিপথেও পানি জমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সকালে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষের ভোগান্তি ছিল সবচেয়ে বেশি। বৃষ্টির মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে পানি মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। কর্মজীবীদের অনেকে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। পানি জমে থাকা সড়কে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে যানজটেরও সৃষ্টি হয়। ফলে অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লেগেছে।

জলাবদ্ধতার সুযোগে রিকশাচালকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও করেছেন নগরবাসী। পানি জমে থাকা অনেক সড়কে রিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহন চলাচল করলেও চালকেরা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাড়তি ভাড়া দাবি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দুর্ভোগের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের ব্যয় আরও বেড়েছে।

বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়েছে নগরীর বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও। নিচু এলাকায় থাকা দোকানগুলোতে পানি প্রবেশ করায় ব্যবসায়ীরা পণ্য ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কোথাও দোকানের সামনে পানি জমে থাকায় ক্রেতাদের প্রবেশও কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে পণ্য নষ্ট হওয়া এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

নগরীর জলাবদ্ধতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি হলেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারী বৃষ্টির সময় সমস্যাটি আবারও প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের সুফল কেন অতিভারী বৃষ্টির সময় প্রত্যাশিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হলে যেকোনো শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ পড়ে। তবে নগরীর খাল, নালা ও ড্রেনের পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কোথাও ময়লা-আবর্জনা জমে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যায়। আবার বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলাধার ভরাটের কারণে অতিরিক্ত পানি ধারণের স্বাভাবিক ব্যবস্থা কমে যাওয়াও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বহদ্দারহাটের খাজা রোড এলাকার বাসিন্দা হাবিব বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই তাঁদের নিচতলায় পানি উঠে যায়। সোমবার সকালে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তাঁর মতো অনেক পরিবারের জন্য বর্ষার প্রতিটি ভারী বৃষ্টিই এখন নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই বৃষ্টির সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখেন।

নগরবাসীর অভিযোগ, জলাবদ্ধতা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নিম্নআয়ের মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন আয়-রোজগার সরাসরি ব্যাহত হয়। পানিতে সড়ক ডুবে গেলে অনেকেই কাজে যেতে পারেন না। আবার যারা কাজে বের হন, তাদের অতিরিক্ত যাতায়াত খরচ গুনতে হয়। নিচু এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ঘরে পানি ঢুকে পড়ার ঝুঁকি থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাহত হয়।

বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ধসের সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় প্রতিবছর বর্ষাকালে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে গেলে ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাসকারী মানুষের জন্য বড় ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে। তাই টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষদের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

এদিকে আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়তে পারে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ইতোমধ্যে জমে থাকা পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। এতে জলাবদ্ধ এলাকার সংখ্যা এবং পানির গভীরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন, ড্রেন ও খালের প্রবাহ সচল রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা শুধু সাময়িক দুর্ভোগের বিষয় নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। প্রতি বর্ষায় একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় নগরবাসী এখন কার্যকর ও টেকসই সমাধান প্রত্যাশা করছেন। অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এর ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সোমবারের অতিবৃষ্টি আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—বহু বছরের প্রকল্প ও উদ্যোগের পরও কেন চট্টগ্রামকে সামান্য সময়ের অতিভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে যেতে হচ্ছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা নতুন করে পর্যালোচনা করে স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে চলমান বৃষ্টিপাতের মধ্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত