বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাকৃবির ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাকৃবির ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্ণাঢ্য আয়োজন ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। মঙ্গলবার দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা, আনন্দ র‌্যালি, পতাকা উত্তোলন, পায়রা ও বেলুন অবমুক্তকরণ, বৃক্ষরোপণ, মাছের পোনা অবমুক্তকরণ এবং বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয়।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রথম প্রহর থেকেই ক্যাম্পাসে ছিল উৎসবের আমেজ। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও আবাসিক হলগুলোতে জাতীয় পতাকার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পতাকা উত্তোলন করা হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে দিনের কর্মসূচি শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ।

সকাল ১০টার দিকে প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন চত্বর থেকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ র‌্যালি বের হয়। র‌্যালিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও অংশ নেন। নানা সড়ক প্রদক্ষিণ করে র‌্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলিপ্যাড এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনন্দ ভাগ করে নিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে র‌্যালিটি হয়ে ওঠে দিনটির অন্যতম আকর্ষণ।

পরে হেলিপ্যাড এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন কমিটির সভাপতি ও ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হকের সভাপতিত্বে এবং সহযোগী ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এ সময় জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি পায়রা অবমুক্ত ও বেলুন উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।

অনুষ্ঠানে কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জি এম মুজিবর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক ও সোনালী দলের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান, রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মো. হেলাল উদ্দীন এবং ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক বক্তব্য দেন। বক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ পথচলা, কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় এর অবদান এবং দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বাকৃবির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী এবং আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন সংগ্রামের কথা স্মরণ করেন তিনি।

উপাচার্য বলেন, ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। এই পথচলায় দেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের প্রয়োজন পূরণে বাকৃবির শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদানও তুলে ধরেন তিনি।

দীর্ঘ ৬৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পথচলায় আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান উপাচার্য। তাঁর বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও সুনাম রক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, মাতৃসম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়; বরং তা আরও বৃদ্ধি পায়—এ জন্য সবাইকে পরিশ্রম, নিয়ম-শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণায় আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হকও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর পর বাংলাদেশের কী ধরনের প্রয়োজন তৈরি হতে পারে, তা এখন থেকেই চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

বাকৃবির ঐতিহ্যগত ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত ৬৫ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় পুষ্টি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং খাদ্যনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করে আসছে। আগামী দিনে তরুণ প্রজন্মকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও নতুন জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এই দায়িত্ব আরও এগিয়ে নিতে হবে। পরিবর্তিত জলবায়ু, কৃষির আধুনিকায়ন, খাদ্য উৎপাদনের নতুন চ্যালেঞ্জ এবং জনসংখ্যার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ও বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও তুলে ধরা হয়। এ উপলক্ষে উপাচার্যের উপস্থিতিতে ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: ৬৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথচলা’ শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অর্জন এবং দীর্ঘ পথচলার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ককে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। উপাচার্যের বাসভবনসংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদে মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। জলজ সম্পদ সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদের উন্নয়নের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষার যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারও প্রতিফলন ঘটে।

একই সঙ্গে হেলিপ্যাডসংলগ্ন এলাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়। সবুজ ক্যাম্পাসের পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এ ধরনের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বৃক্ষরোপণ ও জলজ সম্পদ সংরক্ষণের মতো কর্মসূচি উৎসবের সঙ্গে শিক্ষামূলক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি যোগসূত্র তৈরি করেছে।

দিনের শেষভাগেও ছিল আধ্যাত্মিক ও প্রার্থনামূলক আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মসজিদ ও উপাসনালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের বিভিন্ন সদস্য এসব আয়োজনে অংশ নেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাস, গবেষণার অর্জন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি তৈরির প্রত্যাশা। একটি কৃষিপ্রধান দেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাকৃবির পথচলা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে সময়ের সঙ্গে কৃষির ধরন বদলেছে, বেড়েছে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা, পরিবর্তিত হয়েছে জলবায়ু ও কৃষি উৎপাদনের পরিবেশ। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রেও নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সেই বাস্তবতায় বাকৃবির সামনে যেমন রয়েছে অতীতের অর্জন ধরে রাখার দায়িত্ব, তেমনি রয়েছে ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্র তৈরি করার সুযোগ।

৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই প্রত্যাশাই যেন আরও একবার সামনে এসেছে। আনন্দ, স্মৃতিচারণ, শ্রদ্ধা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনার সমন্বয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ঐতিহ্যকে উদযাপন করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সম্মিলিত অংশগ্রহণে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে বাকৃবির ইতিহাস ও দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

আগামী দিনে শিক্ষা ও গবেষণায় আরও কার্যকর অবদান রেখে দেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা নিয়েই নতুন বছরে পা রাখল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার ৬৬তম বছরে এসে অতীতের সাফল্যকে ভিত্তি করে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী ও সময়োপযোগী ভূমিকা রাখাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়টির সামনে বড় প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত