জুলাই-জুন নয়, এপ্রিল-মার্চে হবে বাংলাদেশের অর্থবছর

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্ষাকালে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং জনদুর্ভোগ কমাতে দেশের অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যমান জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়কে অর্থবছর হিসেবে নির্ধারণ করা হবে।

সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে তাঁর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির সভায় এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে অন্তর্বর্তীকালীন বা ট্রানজিশনাল অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছর হবে নয় মাসের। ওই অর্থবছর শুরু হবে ২০২৭ সালের জুলাইয়ে এবং শেষ হবে ২০২৮ সালের মার্চে। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন নিয়মে এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর কার্যকর হবে।

অর্থ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছর হিসাব করা হয়। এর ফলে অর্থবছরের শেষ দিকে, বিশেষ করে জুন-জুলাই সময়ে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হয়। বর্ষা মৌসুমে এসব কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে প্রকল্পের সময় বাড়ার পাশাপাশি কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের কারণে জনদুর্ভোগও বাড়ে।

সরকারের ধারণা, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে বর্ষা শুরুর আগেই বছরের বড় অংশের অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে এবং অর্থবছরের শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রবণতাও কমতে পারে।

তবে অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তন কেবল বাজেটের হিসাবের সময় বদলের বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সফটওয়্যার, হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং কার্যক্রম ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তিগত অবকাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

এ ছাড়া অর্থবছরের নতুন কাঠামো কার্যকর করতে সংবিধান এবং জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। এসব আইনগত ও প্রশাসনিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

এ লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ এবং অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি অর্থবছর পরিবর্তনের আইনগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতি এবং পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশে জুলাই-জুন অর্থবছর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারি উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা এবং বর্ষা মৌসুমে প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

চলতি বছরের জুনে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করার পক্ষে মত দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অর্থবছরের শেষদিকে বর্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে এডিপির বড় অংশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে অনিয়ম ও অপচয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এর আগে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহল থেকেও অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের দাবি এসেছে। প্রতিবেশী ভারতসহ কয়েকটি দেশে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের কাঠামো চালুর পক্ষে অন্যতম যুক্তি হলো, বর্ষা মৌসুমের আগেই উন্নয়ন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার সুযোগ পাওয়া।

বর্তমান অর্থবছরের কাঠামোয় জুন মাসে সরকারের রাজস্ব আদায় ও উন্নয়ন ব্যয়—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এনবিআর ৩৬ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে অর্থবছরের শেষ দিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়। এতে অনেক প্রকল্পে শেষ মুহূর্তে ব্যয় বাড়ানো, দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা এবং বাস্তবায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়।

সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আহরণ, সরকারি ব্যয়, হিসাবরক্ষণ, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বার্ষিক চক্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তবে সরাসরি এক অর্থবছর থেকে আরেক কাঠামোয় না গিয়ে নয় মাসের ট্রানজিশনাল অর্থবছরের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিবর্তনটি কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নতুন অর্থবছর কাঠামোর মূল লক্ষ্য হবে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সময়ের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সমন্বয় করা। বর্ষার আগে নির্মাণকাজের বড় অংশ শেষ করা গেলে প্রকল্পের গুণগত মান, সময় ব্যবস্থাপনা এবং জনদুর্ভোগ—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছে সরকার।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত