ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মেয়াদ শেষ, এরপর কী?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে গত জুনে করা সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল। তবে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে থেকেই উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ফলে সমঝোতা নবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শনিবার টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। একই সময়ে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গেও পৃথক একটি চুক্তির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন আরাঘচি। তবে রাজনৈতিক সমাধান অর্জিত হলেই ওই চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইরানের দাবি, জুনের সমঝোতাটি যুদ্ধবিরতির চুক্তি ছিল না; বরং যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে একটি কাঠামো তৈরি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। তাই এর মেয়াদ বাড়ানো বা নতুন করে নবায়নের প্রয়োজন দেখছে না ইরান।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, সমঝোতা স্মারকের আওতায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রেখে সেটিকে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ দেওয়ার কথা ছিল। এ আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সামরিক উত্তেজনার কারণে সেই প্রক্রিয়াও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোয় সাম্প্রতিক পরিবর্তনও পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মহসেন রেজাইকে দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও বেসামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাই এ পরিবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশমের মতে, নেতৃত্বে এই পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান মনে করছে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ভবিষ্যতে আলোচনা শুরু হলে তেহরান আগের তুলনায় আরও কঠোর দাবি তুলতে পারে।

এসব দাবির মধ্যে গাজা যুদ্ধের অবসান, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইয়েমেনের ওপর অবরোধ তুলে নেওয়ার মতো বিষয় থাকতে পারে। এমনকি ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়েও ইরান আলোচনায় দাবি তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার নিউইয়র্কে তিনি বলেন, ইরানকে পরাস্ত করার পর হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও জোরালো হবে।

একই দিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ইরানের ওপর এমন কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, যার নজির অতীতে দেখা যায়নি।

তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বার্বারা স্লাভিনের মতে, ইরানের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে কার্যকর বিকল্প খুব বেশি নেই। তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক মোতায়েন অব্যাহত রাখার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, কৌশলগত তেলের মজুত এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা বিমানবাহী রণতরীসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ফলে সামরিকভাবে ওয়াশিংটনের সামনে বিকল্পের পরিমাণ সীমিত হয়ে আসছে।

অর্থনৈতিক চাপের ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইরান এরই মধ্যে প্রণালির ওপর নিজেদের প্রভাব দেখিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বার্বারা স্লাভিনের মতে, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বা রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারে ইরান। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও তেহরানের আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।

তবে সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কোনো একটি চুক্তির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ এখনো রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বড় ধরনের সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ অবশ্য সমঝোতার বর্তমান অবস্থাকে তেহরানের সাফল্য হিসেবেই দেখছেন। শনিবার তেহরানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ইরান যে সুবিধাগুলো অর্জন করেছে, সেগুলো দেশটির জন্য গর্ব ও বিজয়ের প্রতীক।

গালিবাফের ভাষায়, সামরিক ও রাজনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই ইরান চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছে।

সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাই পরিস্থিতি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে—দুই দেশের নতুন করে আলোচনায় বসার ইচ্ছা, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনার মাত্রা এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা। সমঝোতা নবায়ন না হলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি নতুন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পথও তৈরি হতে পারে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত