প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরকে ভেঙে দুটি পৃথক ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন কাঠামোয় একটি প্রতিষ্ঠান রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও গবেষণার দায়িত্ব পালন করবে, অন্যটি রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত থাকবে। সরকারের ধারণা, এই পৃথকীকরণের মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব বাড়বে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় অর্থমন্ত্রী এ সংস্কারের কথা জানান। তিনি বলেন, পুরোনো কাঠামোকে দুই ভাগ করে একটি হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং অন্যটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ। তার ভাষায়, রাজস্ব নীতি বিভাগ সরকারের ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করবে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ হবে ‘অ্যাকশন টিম’, যার মূল দায়িত্ব হবে রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে রাজস্ব প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালেও এনবিআরের কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছিল। সরকারি নথিতেও রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করে দুটি বিভাগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের উল্লেখ ছিল। ফলে মঙ্গলবারের ঘোষণা আগের সংস্কার পরিকল্পনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন রাজস্ব নীতি বিভাগের মূল কাজ হবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক এবং উন্নয়নবান্ধব কর কাঠামো তৈরি করা। করনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের মতামতের ওপর নির্ভর না করে অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক এবং শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে। এর ফলে করনীতি বাস্তব অর্থনীতির প্রয়োজনের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের ওপর থাকবে রাজস্ব আদায়ের বাস্তব দায়িত্ব। কর সংগ্রহ, করদাতাদের সেবা, আইন প্রয়োগ এবং রাজস্ব প্রশাসনের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে আরও দক্ষ করার লক্ষ্যেই এ প্রতিষ্ঠান কাজ করবে। নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পৃথক হওয়ার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দায়িত্বের জায়গাগুলো আরও স্পষ্ট হবে—এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
রাজস্ব সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার বর্তমান দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
এই ব্যবধান পূরণ করতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর শুধু অতিরিক্ত করের চাপ তৈরি করা সমাধান নয় বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। বরং করের আওতা বাড়ানো, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানো, কর ফাঁকি ও কর পরিহার বন্ধ করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে করদাতাদের নিয়ম মেনে কর দেওয়ার প্রবণতা বা কমপ্লায়েন্স বাড়ানোর কথাও তুলে ধরেছেন।
সরকারের নতুন রাজস্ব কাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে করদাতা ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন কমিয়ে আনা। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া একজন করদাতাকে যেন কর কর্মকর্তার কাছে গিয়ে সেবা নিতে না হয়, সে ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসনে একটি ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ এবং ‘ফেসলেস’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।
ইতিমধ্যে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, আসিকুডা ওয়ার্ল্ড, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সম্মেলনে জানানো হয়। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ও বাণিজ্যসংক্রান্ত কার্যক্রমে সময় কমানো, মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমানো এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সরকারের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও সময় উভয়ই কমবে।
রাজস্ব প্রশাসনের এই সংস্কারের সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রারও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় এই লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ শতাংশ বেশি। তিনি স্বীকার করেছেন, এটি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। তবে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ইচ্ছাকৃতভাবে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এত বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে কর আদায় বাড়ানো কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর করের চাপ বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার পরিবর্তে নতুন করদাতা শনাক্ত করা এবং অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক অংশকে ধীরে ধীরে কর কাঠামোর আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও তথ্যের আন্তঃসংযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে যাওয়া। উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য রাষ্ট্রকে নিজস্ব সম্পদ বা রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর অর্থ হলো, সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও জনসেবার অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ রাজস্বের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগের বিষয়। সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। এ হার আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় খুবই কম। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে গড় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকার অর্থ হলো দেশের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় সরকারের কর সংগ্রহের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সরকারি সেবায় অর্থায়নের জন্য সরকারের বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা শুধু কর আদায়ের প্রশ্ন নয়, বরং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত।
তবে এনবিআরকে দুটি প্রতিষ্ঠানে ভাগ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটি নির্ভর করবে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব, জনবল, ক্ষমতা, সমন্বয় এবং জবাবদিহির কাঠামো কতটা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয় তার ওপর। নীতি প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান ও রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল হলে উল্টো প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। ফলে শুধু কাঠামো পরিবর্তন করলেই সংস্কারের লক্ষ্য অর্জিত হবে না; প্রয়োজন হবে দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি, কার্যকর তদারকি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি।
এখানে করদাতাদের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ী যখন কর দিতে গিয়ে জটিল নিয়ম, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা একাধিক দপ্তরের মুখোমুখি হন, তখন কর দেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে। আবার একই সঙ্গে কর ফাঁকি ও অনিয়মের সুযোগ থাকলে সৎ করদাতার ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ পড়ে। তাই সরকারের ঘোষিত ‘ফেসলেস’ ও ‘কন্টাক্ট-ফ্রি’ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে করদাতা ও প্রশাসনের সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে পারে।
রাজস্ব সংস্কারের ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও অংশীদারিকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, সম্প্রসারণের মাধ্যমে করের আওতা বৃদ্ধি এবং অংশীদারির মাধ্যমে ব্যবসায়ী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও অন্যান্য অংশীজনকে নীতি প্রণয়নে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এই তিনটি ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হলে রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়তে পারে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, রাজস্ব সম্মেলন শুধু রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশের আয়োজন নয়; এটি জাতীয় ঐকমত্য গঠনের একটি প্ল্যাটফর্ম। কীভাবে দেশের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রেও সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারের এই সংস্কার পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাস্তবায়ন। এনবিআরকে দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পর করদাতাদের জন্য সেবা কতটা সহজ হয়, রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা কতটা বাড়ে, কর ফাঁকি কতটা কমে এবং নীতি প্রণয়নে অংশীজনদের মতামত কতটা কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়—এসব সূচকের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত সংস্কারের সাফল্য বিচার করা হবে।
একদিকে সরকার যখন উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা চাইছেন কর ব্যবস্থায় হয়রানি ও জটিলতা কমুক। এই দুই প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই নতুন রাজস্ব কাঠামোর বড় চ্যালেঞ্জ। করের হার বাড়ানোর বদলে করের আওতা বাড়ানো, প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে এনবিআরকে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে ভাগ করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নীতি ও ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করে সরকার একদিকে কর কাঠামোকে আরও গবেষণাভিত্তিক ও ব্যবসাবান্ধব করতে চায়, অন্যদিকে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। এখন এই সিদ্ধান্ত কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার আগামী দিনের চিত্র।