বছরের পর বছর সুপ্ত থাকে ফুসফুসের ক্যান্সার, কারা স্ক্রিনিং করাবেন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
বছরের পর বছর সুপ্ত থাকে ফুসফুসের ক্যান্সার, কারা স্ক্রিনিং করাবেন

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফুসফুসের ক্যান্সার এমন এক রোগ, যা অনেক সময় শরীরে নীরবে বেড়ে ওঠে। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। ফলে দীর্ঘদিনের হালকা কাশি, শ্বাস নিতে সামান্য কষ্ট কিংবা বুকের অস্বস্তিকে অনেকেই সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা মনে করে এড়িয়ে যান। পরে যখন কাশি দীর্ঘস্থায়ী হয়, কাশির সঙ্গে রক্ত আসে, বুকের ব্যথা বাড়ে, শ্বাসকষ্ট তীব্র হয় বা অকারণে ওজন কমতে শুরু করে, তখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন অনেকে। কিন্তু ততক্ষণে রোগটি অগ্রসর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় মৃদু হওয়ায় সেগুলো সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে যেতে পারে এবং এতে রোগ শনাক্তে বিলম্ব হতে পারে।

এই বাস্তবতায় ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করার চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফুসফুসের ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের ক্ষেত্রে বর্তমানে লো-ডোজ কম্পিউটেড টমোগ্রাফি বা এলডিসিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত। তবে এই পরীক্ষা সবার জন্য নিয়মিতভাবে করানোর প্রয়োজন নেই। বয়স, ধূমপানের ইতিহাস এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করে নির্দিষ্ট উচ্চঝুঁকির ব্যক্তিদের জন্য এই স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস টাস্ক ফোর্সের বর্তমান সুপারিশ অনুযায়ী, ৫০ থেকে ৮০ বছর বয়সী যেসব ব্যক্তির অন্তত ২০ প্যাক-ইয়ার ধূমপানের ইতিহাস রয়েছে এবং যারা বর্তমানে ধূমপান করেন অথবা গত ১৫ বছরের মধ্যে ধূমপান ছেড়েছেন, তাদের বছরে একবার লো-ডোজ সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে ফুসফুসের ক্যান্সার স্ক্রিনিং করা যেতে পারে। একই ধরনের সুপারিশ আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটিও দিয়েছে। তবে পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে এর সম্ভাব্য উপকার, সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।

এখানে ‘২০ প্যাক-ইয়ার’ কথাটির অর্থ বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো ব্যক্তির পুরো জীবনে মোট কতটা সিগারেট সেবন করেছেন, তার একটি হিসাব। একজন ব্যক্তি গড়ে প্রতিদিন এক প্যাকেট বা প্রায় ২০টি সিগারেট এক বছর ধূমপান করলে সেটি এক প্যাক-ইয়ার হিসেবে গণ্য হয়। ফলে কেউ যদি প্রতিদিন এক প্যাকেট করে ২০ বছর ধূমপান করেন, তার ধূমপানের ইতিহাস হবে ২০ প্যাক-ইয়ার। আবার প্রতিদিন দুই প্যাকেট করে ১০ বছর ধূমপান করলেও হিসাবটি একই—২০ প্যাক-ইয়ার। অর্থাৎ শুধু কত বছর ধূমপান করেছেন তা নয়, প্রতিদিন কী পরিমাণ সিগারেট সেবন করেছেন সেটিও ঝুঁকি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ধূমপান করছেন এমন ব্যক্তিদের পাশাপাশি যারা ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও আগের ধূমপানের ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়া হয়। কারণ ধূমপান বন্ধ করার পর ক্যান্সারের ঝুঁকি সময়ের সঙ্গে কমলেও তা সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে না। ইউএস প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস টাস্ক ফোর্সের সুপারিশে গত ১৫ বছরের মধ্যে ধূমপান ছেড়েছেন এমন ব্যক্তিদেরও নির্দিষ্ট বয়স ও ধূমপানের ইতিহাস থাকলে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় রাখা হয়েছে। তবে কেউ ১৫ বছর ধরে ধূমপানমুক্ত থাকলে সাধারণত ওই সুপারিশ অনুযায়ী স্ক্রিনিং বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

লো-ডোজ সিটি স্ক্যান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও জানা প্রয়োজন। সাধারণ বুকের এক্স-রে দিয়ে ফুসফুসের খুব ছোট অস্বাভাবিকতা বা টিউমার সবসময় সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে এলডিসিটি ফুসফুসের তুলনামূলক বিস্তারিত ছবি তৈরি করতে পারে এবং ছোট অস্বাভাবিকতাও শনাক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে কোনো উপসর্গ প্রকাশের আগেই সম্ভাব্য ক্যান্সারের চিহ্ন খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়। উচ্চঝুঁকির মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্ক্রিনিং ফুসফুসের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

তবে স্ক্রিনিং মানেই ক্যান্সার নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হওয়া নয়। সিটি স্ক্যানে কোনো গুটি বা অস্বাভাবিকতা দেখা গেলেই সেটি ক্যান্সার—এমন ধারণা ভুল। অনেক সময় নিরীহ গুটি, সংক্রমণ বা অন্য কোনো কারণে ফুসফুসে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। সে কারণে স্ক্রিনিংয়ের ফল অস্বাভাবিক হলে চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী পুনরায় স্ক্যান, অতিরিক্ত পরীক্ষা বা প্রয়োজন হলে টিস্যু পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। আবার স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এমন কিছু অস্বাভাবিকতাও ধরা পড়তে পারে, যেগুলো কখনো গুরুতর সমস্যা তৈরি করত না। এ কারণে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া শুধু ভয় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে বারবার সিটি স্ক্যান করানোও ঠিক নয়।

ফুসফুসের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ধূমপান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর একটি। তবে শুধু ধূমপায়ীরাই এই রোগে আক্রান্ত হন—এমন ধারণাও সঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পরোক্ষ ধূমপান, বায়ুদূষণ, কর্মক্ষেত্রে কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক ও পদার্থের সংস্পর্শ এবং অন্যান্য পরিবেশগত কারণও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য শারীরিক কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ধূমপান না করলেও দীর্ঘদিনের ক্ষতিকর পরিবেশগত সংস্পর্শ বা অন্য ঝুঁকি থাকলে নিজের স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।

তবে ঝুঁকি থাকার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক অধূমপায়ীকে নিয়মিত লো-ডোজ সিটি স্ক্যান করাতে হবে। বর্তমানে প্রচলিত বড় স্ক্রিনিং নির্দেশনাগুলো মূলত নির্দিষ্ট বয়স ও উল্লেখযোগ্য ধূমপানের ইতিহাস থাকা উচ্চঝুঁকির ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে তৈরি। অধূমপায়ী ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ভর করবে তার ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও চিকিৎসাগত পরিস্থিতির ওপর।

আরেকটি বিষয় হলো, স্ক্রিনিং এবং রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর পরীক্ষা—দুটি আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির দীর্ঘদিন ধরে কাশি থাকলে, কাশির সঙ্গে রক্ত এলে, শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকলে, বুকের ব্যথা হলে, অকারণে ওজন কমলে, অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে কিংবা বারবার ফুসফুসের সংক্রমণ হলে শুধু স্ক্রিনিংয়ের বয়স বা ধূমপানের হিসাব মিলছে কি না, সেটি দেখার অপেক্ষা করা উচিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এসব লক্ষণ ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যদিও একই ধরনের লক্ষণ অন্য অনেক রোগেও দেখা যায়। তাই এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ফুসফুসের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলোর একটি হলো ধূমপান না করা এবং ধূমপান করলে তা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। দীর্ঘদিন ধূমপানের অভ্যাস থাকলেও যেকোনো বয়সে তা বন্ধ করা স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যারা ধূমপান করছেন এবং স্ক্রিনিংয়ের জন্য চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন, তাদের ধূমপান ছাড়ার সহায়তাও দেওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞ নির্দেশনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও বিষয়টি অবহেলার সুযোগ নেই। শহরাঞ্চলের বায়ুদূষণ, তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার এবং বিভিন্ন পেশায় ধুলা, ধোঁয়া বা রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকা মানুষের সংখ্যা কম নয়। ফলে ফুসফুসের স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে সচেতনতার অর্থ নিজের সিদ্ধান্তে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো নয়; বরং ঝুঁকি বুঝে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফুসফুসের ক্যান্সার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া। ৫০ থেকে ৮০ বছর বয়সী কেউ যদি বর্তমানে ধূমপান করেন বা আগে ধূমপান করে থাকেন এবং তার ধূমপানের ইতিহাস ২০ প্যাক-ইয়ার বা তার বেশি হয়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে লো-ডোজ সিটি স্ক্রিনিং নিয়ে আলোচনা করা যুক্তিযুক্ত। তবে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, পূর্ববর্তী রোগ, চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

কারণ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগের শুরুতেই যদি ঝুঁকি শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করা যায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার সুযোগ বাড়ে। তাই দীর্ঘদিনের ধূমপানের ইতিহাস থাকলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা, অস্বাভাবিক উপসর্গকে অবহেলা না করা এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করাই হতে পারে ফুসফুসকে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত