প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে আবারও দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন শত শত মানুষ। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। বিশেষ করে জুলাই ও আগস্টে সংক্রমণের গতি যেভাবে বেড়েছে, তাতে আগামী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৪ হাজার ৮৪৮ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৭১ জনের। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮৭০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে জুন থেকে পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিবর্তন দেখা দেয়। জুন মাসে ২ হাজার ৯০৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টের প্রথম ১৭ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৫৩৮ জন। অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টের প্রথম ১৭ দিনেই ১৮ হাজার ৭৪৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সংক্রমণের এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি সামনে আরও বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডেঙ্গু দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও এবারের চিত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণের বিস্তার বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরের অংশে সবচেয়ে বেশি ১৮১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে খুলনা বিভাগে ১৫৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৪৬ জন, বরিশালে ১০২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭৭ জন, রাজশাহীতে ৫৭ জন, ময়মনসিংহে ৫১ জন এবং রংপুরে ১৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরের মোট আক্রান্তের হিসাবেও ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোর সংক্রমণ পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মোট ২৪ হাজার ৮৪৮ রোগীর মধ্যে সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার রোগী ১৭ হাজার ৯৬৭ জন। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৫১৫ জন। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু রাজধানী নয়, দেশের প্রত্যন্ত জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সমান গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। গত ১১ আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছরে সেখানে ১ হাজার ১৯৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মারা গেছেন তিনজন। শুধু আগস্টের প্রথম ১১ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬১ জন। অর্থাৎ চট্টগ্রামে চলতি মাসে সংক্রমণের গতি আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি জরিপেও চট্টগ্রাম নগরীর কয়েকটি এলাকায় এডিস মশার প্রজননের ঝুঁকি উঠে এসেছে। নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। একইভাবে পরীক্ষা করা ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। জরিপের ভিত্তিতে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের মতে, বর্ষাকালে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি থাকে। আগস্টে সংক্রমণের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে এডিস মশার বংশবৃদ্ধিই প্রধান কারণ। বৃষ্টির পানি জমে থাকা বিভিন্ন পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত সামগ্রী কিংবা বাড়ির আশপাশের ছোট ছোট জলাধার এ মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। ফলে শুধু বড় জলাবদ্ধতা নয়, অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিও সংক্রমণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে চলতি বছরের মৃত্যুর পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৭১ জনের মধ্যে ২৮ জন পুরুষ এবং ৪৩ জন নারী। বয়সভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে। ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী আটজন এবং ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সাতজন মারা গেছেন। ১৫ বছর বা এর কম বয়সী অন্তত নয়জনও ডেঙ্গুতে মারা গেছে।
মাসভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবেও সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহতা স্পষ্ট। শুধু জুলাই মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের। জুনে মারা গেছেন ১৩ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশ ঘটেছে জুন ও জুলাই মাসে। আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এ মাস ও পরবর্তী মাসগুলোতে মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকীও সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমি, পেটে ব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা উচিত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো তুলনামূলক কম। তবে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলায় জেলায় চিকিৎসার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের এলাকায় কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এ বিষয়ে সক্রিয় হতে হবে।
আগামী কয়েক সপ্তাহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আগস্টে সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেটি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই মশক নিয়ন্ত্রণ, রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে সামনে সম্ভাব্য বড় ধরনের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।