বিদ্যুৎহীন হয়ে চার দিন অচল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
বিদ্যুৎহীন হয়ে চার দিন অচল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ চীন সাগরে তীব্র গরম ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কবলে পড়ে টানা চার দিন অচল ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাহাজটির শৌচাগার, রান্নাঘর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পানীয় জল সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাও ব্যাহত হয়। প্রায় ১০ হাজার টন ওজনের যুদ্ধজাহাজটির নাবিকদের জন্য পরিস্থিতিটি ছিল একই সঙ্গে অস্বস্তিকর ও চ্যালেঞ্জিং।

ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ জুলাই। ওই সময় আর্লেই বার্ক-শ্রেণির গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস বেনফোল্ড ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিয়মিত সামরিক দায়িত্ব পালন করছিল। জাহাজটির জেনারেটরে প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে শুধু জাহাজের অভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক কার্যক্রমই ব্যাহত হয়নি, বরং নিজস্বভাবে দিক পরিবর্তন বা চলাচলের সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে জাহাজটি।

মার্কিন সপ্তম নৌবহরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নাবিকেরা দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন। তবে ত্রুটির কারণে কয়েক দিন ধরে জাহাজটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত ছিল। তীব্র গরমের মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নাবিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে রান্নাঘর অচল থাকায় জাহাজে নিয়মিত খাবার প্রস্তুত করাও সম্ভব হচ্ছিল না।

সপ্তম নৌবহরের মুখপাত্র নৌ কমান্ডার ম্যাথিউ কোমার জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ইউএসএস বেনফোল্ড নিজস্বভাবে দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা হারিয়েছিল। তবে তিনি বলেন, এ ঘটনায় কোনো নাবিক আহত হননি। জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও জাহাজের সদস্যরা দৃঢ়তা, সাহস ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন।

চার দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকার সময় জাহাজটির নাবিকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করতে হয় অন্য একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে। ইউএসএস রবার্ট স্মলস নামের একটি গাইডেড-মিসাইল ক্রুজার বেনফোল্ডের নাবিকদের জন্য রান্না করা খাবার সরবরাহ করে। একই সময়ে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের অন্যান্য জাহাজও বেনফোল্ডকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়।

ঘটনার পর ইউএসএস বেনফোল্ডকে মেরামতের জন্য ফিলিপাইনের সুবিক বে এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। মেরামতকাজ শেষ হওয়ার পর ৮ আগস্ট জাহাজটি আবার দায়িত্বে ফিরে যায়। তবে ঠিক কী কারণে জেনারেটরে ওই প্রকৌশলগত ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, তা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী।

দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো নিয়মিত টহল, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার টন ওজনের একটি ডেস্ট্রয়ারের নিজস্ব চলাচলের সক্ষমতা হারিয়ে চার দিন অচল হয়ে পড়ার ঘটনা নৌবাহিনীর জন্য প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধজাহাজের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু আলো, রান্নাঘর কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের মতো দৈনন্দিন সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। একটি আধুনিক ডেস্ট্রয়ারের যোগাযোগ, নেভিগেশন, অস্ত্রব্যবস্থা, সেন্সর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জাহাজের জেনারেটরে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিলে এর প্রভাব জাহাজের সামগ্রিক কার্যক্ষমতার ওপর পড়তে পারে।

ইউএসএস বেনফোল্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে নাবিকদের দৈনন্দিন জীবনও কঠিন হয়ে পড়ে। দক্ষিণ চীন সাগরের উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া জাহাজের ভেতরের পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে। এর সঙ্গে পানীয় জল সরবরাহ ও রান্নার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নাবিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। তবে অন্য জাহাজের সহায়তায় খাবারসহ প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

এই ঘটনার সময় ইউএসএস বেনফোল্ড একা ছিল না। ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের অন্যান্য জাহাজের সহায়তা পাওয়ায় জাহাজটির নাবিকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। সমুদ্রের মাঝখানে কোনো যুদ্ধজাহাজ যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত সমস্যায় পড়লে একই বহরের অন্যান্য জাহাজের সহযোগিতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনাটি তার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর বাড়তে থাকা দায়িত্ব ও দীর্ঘ সময়ের সামরিক মোতায়েন নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দায়িত্ব পালনের কারণে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও নাবিকদের ওপর চাপ বেড়েছে বলে বিশ্লেষক ও কিছু ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা মন্তব্য করেছেন।

দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করা নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক চাপ নিয়েও এর আগে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন দীর্ঘ সময় কোনো বন্দরে না থেমে দায়িত্ব পালন করায় ওই জাহাজের নাবিকদের মনোবল ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনা মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাবিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।

তবে ইউএসএস বেনফোল্ডের বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে নৌবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে দেখার আগে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন। জাহাজটির জেনারেটরে কেন ত্রুটি দেখা দিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

চার দিন পর মেরামত শেষে বেনফোল্ড আবার দায়িত্বে ফিরেছে। ফলে আপাতত জাহাজটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ চীন সাগরের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একটি আধুনিক মার্কিন যুদ্ধজাহাজের দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন ও অচল হয়ে থাকার ঘটনা সামরিক জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত