২০ বিদ্রোহী এমপিকে অযোগ্য ঘোষণার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে অভিষেক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
২০ বিদ্রোহী এমপিকে অযোগ্য ঘোষণার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে অভিষেক

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট এবার গড়াল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। দলত্যাগী ২০ জন লোকসভা সদস্যকে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবিতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, লোকসভার মহাসচিব এবং সংশ্লিষ্ট ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দলত্যাগবিরোধী আইনের আওতায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তি চেয়েই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিষেকের আবেদনের কেন্দ্রীয় অভিযোগ হলো, তৃণমূলের ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে অযোগ্যতার আবেদন জমা দেওয়ার পরও লোকসভার স্পিকার যথাসময়ে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বারবার আবেদন, স্মারকলিপি ও বৈঠকের পরও বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় দলত্যাগবিরোধী আইনের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর আগে ১৯ জুন স্পিকারের কাছে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে অযোগ্যতার দাবি জানানো হয়েছিল। এরপর ২৭ জুলাই লিখিত স্মারকলিপি দেওয়া হয় এবং ১২ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে ফলো-আপ বৈঠকও করেন অভিষেক। তারপরও সিদ্ধান্ত না আসায় এবার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পথ বেছে নিয়েছে তৃণমূল।

ভারতের সংবিধানের দশম তফসিলের আওতায় দলত্যাগের কারণে কোনো সংসদ সদস্যের অযোগ্যতার প্রশ্ন উঠতে পারে। ১৯৮৫ সালের দলত্যাগের কারণে লোকসভা সদস্যদের অযোগ্যতা-সংক্রান্ত বিধিতেও স্পিকারের কাছে এ ধরনের আবেদনের প্রক্রিয়া নির্ধারিত রয়েছে। তৃণমূলের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সাংসদরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রকাশ্যে অন্য রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছেন এবং সংসদীয় অবস্থানও পরিবর্তন করেছেন। ফলে তাঁদের সাংসদ পদ বহাল রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দলটির দাবি, বিষয়টি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়; এর সঙ্গে সংসদীয় গণতন্ত্র, ভোটারের রায় এবং দলত্যাগবিরোধী আইনের কার্যকর প্রয়োগের প্রশ্নও জড়িত।

চলতি বছরের জুনে তৃণমূলের ২০ জন লোকসভা সদস্য জাতীয়তাবাদী সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া বা এনসিপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেন। তাঁদের দাবি ছিল, তাঁরা তৃণমূল থেকে বেরিয়ে ওই দলে একীভূত হয়েছেন এবং সংসদে আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে বসার অনুমতি চেয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের কথাও জানান। এই পদক্ষেপের পরই তৃণমূলের পক্ষ থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগের অভিযোগ তুলে অযোগ্যতার আবেদন করা হয়।

বিদ্রোহী সাংসদদের অবস্থানের পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন। ভারতের দলত্যাগবিরোধী আইনে সাধারণভাবে কোনো সাংসদ স্বেচ্ছায় নিজের রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ ত্যাগ করলে অযোগ্যতার প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে একই আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দলীয় একীভূতকরণের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। বিদ্রোহী সাংসদদের বক্তব্য, তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যক সদস্য একসঙ্গে নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন। ফলে এটি সাধারণ দলত্যাগ নয়, বরং সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত একীভূতকরণ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এ কারণেই বিষয়টি এখন কেবল স্পিকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আদালতের ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তৃণমূল অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। দলটির বক্তব্য, নির্বাচনের সময় সংশ্লিষ্ট ২০ সাংসদ তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবেই ভোট চেয়েছিলেন এবং দলীয় প্রতীক ব্যবহার করেই নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে অন্য একটি দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে সাধারণ রাজনৈতিক মতবদল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছে দলটি। অভিষেকের যুক্তি, সাংসদদের যদি তৃণমূলের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক না থাকে, তাহলে তাঁদের উচিত ছিল সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে নতুন করে জনগণের কাছে ভোট চাওয়া।

এই বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লোকসভায় আসন বিন্যাস। তৃণমূলের অভিযোগ, বিদ্রোহী সাংসদদের দলবদল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত না হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের সামনের সারির আসনে বসানো হয়েছে এবং তৃণমূলের অন্য সদস্যদের তুলনামূলক পেছনের সারিতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলটির মতে, স্পিকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা সংসদে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের অবস্থান সম্পর্কে একটি প্রশাসনিক স্বীকৃতির ইঙ্গিত বহন করতে পারে। যদিও এই অভিযোগের চূড়ান্ত সাংবিধানিক মূল্যায়ন আদালতের বিষয়।

এর আগে জুনে বিদ্রোহী সাংসদরা স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে নিজেদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে বসার অনুমতি চেয়েছিলেন। তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ২০ জন সাংসদ তৃণমূল থেকে নির্বাচিত হলেও তাঁরা এনসিপিআইয়ের সঙ্গে একীভূত হয়েছেন এবং এনডিএর সঙ্গে কাজ করতে চান। সেই সময় থেকেই তাঁদের অবস্থান নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

এনসিপিআই নিজেও আগে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে খুব পরিচিত কোনো শক্তি ছিল না। ২০২৬ সালের জুনে ২০ জন তৃণমূল সাংসদের যোগদানের পর দলটি হঠাৎ করেই লোকসভা রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সাংসদদের যোগদানের ফলে দলটি সংসদে একটি উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠীতে পরিণত হয় এবং এনডিএর সমর্থক হিসেবে তার গুরুত্বও বেড়ে যায়।

তৃণমূলের জন্য এই সংকটের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর দলটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রকাশ্যে আসে এবং লোকসভায় ২০ সাংসদের বিদ্রোহ সেই সংকটকে জাতীয় রাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। একসঙ্গে এতজন সাংসদের দলত্যাগ তৃণমূলের সংসদীয় শক্তি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরের কাছে এটি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের সুযোগ। ফলে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া আবেদনটি শুধু ২০ সাংসদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং তৃণমূলের সংসদীয় রাজনীতির গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে।

অভিষেকের এই আইনি লড়াইয়ের আরেকটি তাৎপর্য হলো, দলত্যাগবিরোধী আইনের প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে আসা। ভারতে স্পিকারই সাধারণত সংসদ সদস্যের দলত্যাগজনিত অযোগ্যতার বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা হলে সেই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তৃণমূল এখন সেই বিলম্বকেই সুপ্রিম কোর্টের সামনে প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেছে। এর ফলে আদালত যদি আবেদনের শুনানি গ্রহণ করে, তাহলে স্পিকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা এবং দলত্যাগবিরোধী বিধানের প্রয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।

এখন নজর থাকবে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আদালত আবেদনটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে কি না, করলে কী ধরনের নির্দেশ দেয় এবং লোকসভা স্পিকারকে কোনো সময়সীমার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে বলে কি না—এসব প্রশ্নই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্রোহী সাংসদদের দাবি করা একীভূতকরণ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

একদিকে তৃণমূল চাইছে দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে দ্রুত সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক, অন্যদিকে বিদ্রোহী সাংসদরা তাঁদের অবস্থানকে দলত্যাগ নয়, বরং বৈধ রাজনৈতিক একীভূতকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। ফলে এই লড়াই এখন আর শুধু তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়; এটি ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে দলত্যাগ, সাংসদদের দায়বদ্ধতা এবং ভোটারদের রায়ের মর্যাদা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের রূপ নিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে, এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক টানাপোড়েন কোন দিকে মোড় নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত