প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। নতুন রয়টার্স-ইপসোস জনমত জরিপে তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে ৩৩ শতাংশে, যা তাঁর বর্তমান মেয়াদের সর্বনিম্ন। বিপরীতে ৬৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, তাঁরা ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এই পতন মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান শিবিরের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চার দিন ধরে পরিচালিত এই অনলাইন জরিপে ১ হাজার ১৬৬ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। জরিপের ফলাফলে অনুমানগত ভুলের সীমা প্রায় ৩ শতাংশ পয়েন্ট। আগস্টের শুরুতে একই সংস্থার জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ছিল ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানেই তাঁর জনপ্রিয়তা আরও দুই শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে এটিই তাঁর সবচেয়ে কম অনুমোদনের হার।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক হামলায় জড়িয়ে পড়ার পর সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে। ফলে যুদ্ধের সামরিক পরিণতির পাশাপাশি এর সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাবও এখন সাধারণ মার্কিন পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে অনুভূত হচ্ছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। যুদ্ধের বিষয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও এই সামরিক পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দেখা যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় নিরাপত্তা, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাকে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যুদ্ধের সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের একটি বড় অংশ যদি মনে করে সংঘাতের কোনো দ্রুত সমাধান হচ্ছে না এবং এর অর্থনৈতিক মূল্য তাদেরই দিতে হচ্ছে, তাহলে সেই রাজনৈতিক বার্তার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়টি তাই এখন শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি চালানো, কর্মস্থলে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কেনাকাটার খরচ—সবকিছুর সঙ্গে জ্বালানি মূল্যের সম্পর্ক রয়েছে। তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব পরে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধ নিয়ে যাঁদের সরাসরি রাজনৈতিক মতামত নেই, তাঁরাও মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে এর প্রভাব অনুভব করতে পারেন।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে সহজে এড়িয়ে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় হয়ে থাকেনি। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগও বাড়ছে। একই সময়ে রিপাবলিকানদের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও জনমত ডেমোক্র্যাটদের দিকে কিছুটা ঝুঁকছে।
অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে এই পরিবর্তন আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা সরাসরি কংগ্রেসের নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে না, তবে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সামগ্রিক জনমত নির্বাচনে ভোটারদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো যখন মানুষের প্রধান উদ্বেগ হয়ে ওঠে, তখন ক্ষমতাসীন দলের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্পের জন্য আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো অভিবাসন নীতিতে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের জনসমর্থনের ব্যবধানও কমে আসা। রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, অভিবাসন ইস্যুতে রিপাবলিকানদের যে বড় সুবিধা ছিল, তা অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই ইস্যুতে রিপাবলিকানদের ব্যবধান যেখানে ২৬ শতাংশ পয়েন্ট ছিল, তা এখন মাত্র ২ শতাংশ পয়েন্টে নেমে এসেছে।
এর অর্থ হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এমন একটি সময়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে, যখন সাধারণ ভোটারদের কাছে নিরাপত্তা ও অভিবাসনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বস্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলে অভিবাসন একটি বড় ইস্যু হলেও বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সেই বার্তা দিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ পুরোপুরি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
তবে ৩৩ শতাংশ অনুমোদনের হারকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই তীব্রভাবে বিভক্ত। ট্রাম্পের প্রতি রিপাবলিকান ভোটারদের সমর্থন এখনো তাঁর সামগ্রিক জাতীয় অনুমোদনের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি এখনো নিজ দলের ভোটারদের মধ্যে দৃঢ় সমর্থন। প্রশ্ন হলো, সেই সমর্থন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট হবে কি না।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতেও ইরানে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন জনমতে বিভাজন স্পষ্ট হয়েছিল। একটি রয়টার্স-ইপসোস জরিপে ৪৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার বিরোধিতা করেছিলেন, বিপরীতে ২৭ শতাংশ সমর্থন করেছিলেন এবং ২৯ শতাংশ নিশ্চিত ছিলেন না। একই জরিপে ৬০ শতাংশ মনে করেছিলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বর্তমান জরিপে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠায় বোঝা যাচ্ছে, সময় যত গড়াচ্ছে, সামরিক অভিযানের প্রতি সংশয়ও তত বাড়ছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এমন প্রত্যাশা পূরণ না হলে রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সংঘাতের কারণে যদি জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ট্রাম্পের সামনে এখন তাই দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সামরিক ও কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা, অন্যদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের উদ্বেগ কমানো। শুধু সামরিক বিজয়ের দাবি যথেষ্ট হবে না; সাধারণ মানুষের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি মূল্য এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্যও উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে রিপাবলিকান নেতৃত্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভোটারদের সংশয় বাড়ছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এটি দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে হোয়াইট হাউসের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার প্রচেষ্টা ভেঙে পড়ার পর তেহরান আরও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থানের হুমকি দিয়েছে। একই সময়ে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও চাপে রয়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯১ ডলারের ওপরে ওঠে, যা সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।
এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ৩৩ শতাংশে নেমে আসা শুধু একটি জনমত জরিপের সংখ্যা নয়। এটি মার্কিন ভোটারদের কাছে যুদ্ধ, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। যুদ্ধের ময়দানে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সফল হচ্ছে, তার পাশাপাশি আমেরিকান পরিবারগুলো প্রতিদিন কতটা স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারছে—রাজনৈতিকভাবে সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এই জনমত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ট্রাম্প যদি যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারেন, জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল করতে পারেন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ কমাতে সক্ষম হন, তাহলে বর্তমান ক্ষয় সামাল দেওয়ার সুযোগ থাকবে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির চাপ অব্যাহত থাকলে ৩৩ শতাংশ অনুমোদনের হার রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। আপাতত তাই ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু যুদ্ধের ফল কী হবে তা নয়, বরং সেই যুদ্ধের মূল্য দিতে গিয়ে মার্কিন ভোটাররা শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনীতিকে কতটা গ্রহণ করবেন।