সাবেক মন্ত্রী সতীশ চন্দ্র রায় আর নেই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
সাবেক মন্ত্রী সতীশ চন্দ্র রায় আর নেই

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সতীশ চন্দ্র রায় আর নেই। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দিনগত রাত ১০টা ৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৫ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন বড় ছেলে অরবিন্দু রায়।

প্রবীণ এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে দিনাজপুরের বিরলসহ তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শিক্ষকতা থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে আসা সতীশ চন্দ্র রায় স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে এসে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিস্তার ছিল কয়েক দশকজুড়ে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুর ১২টায় দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ৯ নম্বর মঙ্গলপুর ইউনিয়নের মোস্তফাবাদ গ্রামে তাঁর পারিবারিক শ্মশানে শেষকৃত্য ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। শেষ বিদায়ের এই আয়োজনে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্থানীয় মানুষ অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

সতীশ চন্দ্র রায় ১৯৪১ সালের ৩০ নভেম্বর দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মোস্তফাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোরের পর ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে পেশাগত জীবনে শিক্ষকতা করলেও রাজনীতির প্রতি তাঁর সক্রিয়তা ক্রমেই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন এবং জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পথচলায় তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথমদিকে দিনাজপুর-৭ আসন থেকে এবং পরবর্তীতে দিনাজপুর-২ আসন থেকে তিনি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর নির্বাচনী রাজনীতির বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল দিনাজপুরের স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সতীশ চন্দ্র রায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের নীতি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান তিনি। তাঁর মন্ত্রিত্বের সময় মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, প্রাথমিক শিক্ষা ও গণশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক তৈরি হয়।

সতীশ চন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তাঁর অবস্থান। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পর তিনি দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রবীণ নেতা হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখেন।

তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যেও দেখা যায়, শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও রাজনীতিই পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রধান পরিচয়ে পরিণত হয়। ১৯৭৯ সালে দিনাজপুর-৭ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পরে ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও দিনাজপুর-২ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এভাবে জাতীয় সংসদে একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সতীশ চন্দ্র রায় স্থানীয় রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির মধ্যে একটি সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করেছেন। দিনাজপুরের গ্রামীণ জনপদ থেকে উঠে এসে তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে এলাকার মানুষের বিভিন্ন দাবি, উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও যুক্ত ছিল। ফলে তাঁর মৃত্যুর খবর স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

প্রবীণ এই নেতার মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। বয়সজনিত নানা জটিলতার কারণে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রাজধানী বা অন্য কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে নয়, দীর্ঘ জীবনের শেষ পর্যায়ে শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতাকে হারানোর বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে দিনাজপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনেও তৈরি হয়েছে শূন্যতা।

মৃত্যুকালে সতীশ চন্দ্র রায় স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, অনুসারী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষজনের কাছে তাঁর চলে যাওয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নয়, বরং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সতীশ চন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। ছাত্রজীবনের রাজনীতি, শিক্ষকতা, সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন, মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব—প্রতিটি ধাপেই তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর মতো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতারও অবসান ঘটে।

বিশেষ করে দিনাজপুরের রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় রাজনীতির মাঠ থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করার কারণে তাঁর সঙ্গে এলাকার বহু মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকা প্রবীণ নেতাদের ব্যক্তিগত পরিচিতি ও সামাজিক যোগাযোগ অনেক সময় দলীয় সীমারেখার বাইরেও বিস্তৃত হয়। সতীশ চন্দ্র রায়ের ক্ষেত্রেও এমন একটি দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছিল বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তাঁর শেষকৃত্য মোস্তফাবাদ গ্রামের পারিবারিক শ্মশানে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। জন্মভূমির মাটিতেই শেষ বিদায় নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ জীবনের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটবে। পরিবার, স্বজন ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা শেষবারের মতো তাঁকে শ্রদ্ধা জানাবেন।

সতীশ চন্দ্র রায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও একজন প্রবীণ নেতার অধ্যায় শেষ হলো। শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি, সংসদ সদস্য থেকে মন্ত্রী এবং পরে দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন—দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন। তাঁর মৃত্যু তাঁর পরিবার ও স্বজনদের জন্য যেমন গভীর শোকের, তেমনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও অনুসারীদের কাছেও এটি এক বেদনাবিধুর বিদায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত