প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যুর পরিস্থিতি আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে এমন কোনো দিন যায়নি, যেদিন হাম বা হামসদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত কোনো শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই হাম-রুবেলার টিকার কোনো ডোজ নেয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া বিপুলসংখ্যক শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৬ লাখ শিশুকে চিহ্নিত করে তাদের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় টিকা রয়েছে এবং বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে তাদের টিকাদানের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্যসচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে তৈরি হওয়া ঘাটতি ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করেছে। কোনো একটি বছরে যদি মোট শিশুর একটি অংশ টিকা থেকে বাদ পড়ে এবং পরের বছরও একই ধরনের ঘাটতি থেকে যায়, তাহলে কয়েক বছর পর টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বর্তমানে দেশের হাম পরিস্থিতিতে সেই দীর্ঘদিনের ঘাটতির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ে বড় আকারের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় না। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা পাওয়া এবং পরবর্তী ডোজও যথাসময়ে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো এলাকায় টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেখানে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও তৈরি হয়।
চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে বড় আকারে দেখা দেওয়ার পর সরকার ৫ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে লক্ষ্য করে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য তুলনা করে দেখা যায়, আরও বিপুলসংখ্যক শিশু টিকাদানের আওতার বাইরে রয়েছে।
গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়েছিল। হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এই সংখ্যার তুলনা করলে প্রায় ৪৬ লাখ শিশুর ব্যবধান দেখা যায়। এই ব্যবধানই নিয়মিত ও জরুরি টিকাদান কার্যক্রমের মধ্যে থাকা ঘাটতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত কভারেজ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্ন বিশ্লেষণও রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভ্যাকসিনোলজিস্ট ডা. তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, হাম-রুবেলার টিকার কভারেজ শতভাগ হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত কভারেজ প্রায় ৮১ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে। তাঁর মতে, সংক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় টিকাদান না হলে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে এবং তার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকিও থেকে যাবে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আক্রান্তদের বয়স। কেবল টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সের ছোট শিশুরাই নয়, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম শনাক্ত হচ্ছে। এ কারণে টিকাদান কর্মসূচির আওতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী অন্তত ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
হামের সংক্রমণের ভয়াবহতা বোঝা যায় মৃত্যুর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১৮। এর মধ্যে ৮১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে সন্দেহভাজন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং পরীক্ষাগারে ৯৯ জনের হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। ফলে দেশে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০। এ ছাড়া পরীক্ষাগারে আরও ৫৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এতে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৮৯।
এই পরিসংখ্যানের মধ্যে প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবারের উদ্বেগ, অপেক্ষা এবং অনেক ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতির গল্প বহন করে। হামকে অনেক সময় সাধারণ শৈশব রোগ হিসেবে দেখা হলেও এর জটিলতা মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর অবস্থায় যেতে পারে। ফলে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা এখন শুধু একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, বরং শিশুর জীবন রক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ।
সরকারের পরবর্তী পরিকল্পনায় তাই টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্তকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ১৬ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় টিকা সরকারের হাতে রয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিসেফের মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আরও ২৫ লাখ টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৪১ কোটি টাকার টিকা ইতোমধ্যে পাইপলাইনে রয়েছে এবং চলতি মাসের শেষদিকে সেগুলো দেশে আসতে শুরু করার কথা। এসব টিকার মধ্যে হাম-রুবেলার পাশাপাশি আরও কয়েক ধরনের টিকাও থাকবে।
বাংলাদেশে হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু নিয়মিত কর্মসূচিতে কোনো পর্যায়ে শিশু বাদ পড়লে তার প্রভাব কয়েক বছর পর দৃশ্যমান হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে, টিকাদানকে কেবল একটি ক্যাম্পেইন হিসেবে দেখলে হবে না; বরং জন্মের পর থেকে নির্ধারিত বয়সে প্রতিটি শিশুকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণেও টিকাবঞ্চিত শিশুদের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হাম-রুবেলার কোনো টিকা পায়নি। একই বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল এমন বয়সী, যাদের কেউ কেউ নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে। ফলে টিকাদানের পাশাপাশি নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের সুরক্ষা নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ইউনিসেফও এপ্রিল মাসে জানিয়েছিল, জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর লাখ লাখ শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনা হয়েছিল। সংস্থাটি তখনও সতর্ক করেছিল যে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের গতি ধরে রাখা জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া। দেশের প্রত্যন্ত এলাকা, শহরের বস্তি, চলমান বা স্থানান্তরিত পরিবার এবং বিভিন্ন কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুরা এই তালিকায় থাকতে পারে। তাই মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে তথ্য যাচাই, বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
হামের এই প্রাদুর্ভাব একই সঙ্গে দেশের টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলোও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে বড় ক্যাম্পেইন চালানোর পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতি কোথায় তৈরি হচ্ছে, কেন শিশু বাদ পড়ছে এবং সেই ঘাটতি কীভাবে দ্রুত পূরণ করা যায়—এসব বিষয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
কারণ একটি শিশুর টিকা না নেওয়া শুধু তার নিজের জন্য নয়, তার পরিবার ও আশপাশের অন্য শিশুদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একটি এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকার আওতায় থাকলে সংক্রমণের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। বিপরীতে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বাড়লে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এখন তাই ১৬ লাখ টিকাবঞ্চিত শিশুকে দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পাইপলাইনে থাকা টিকা যথাসময়ে দেশে এনে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে নতুন করে কোনো শিশু বাদ না পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
হামে শিশুমৃত্যুর ৯২ শতাংশের সঙ্গে টিকাবঞ্চিত থাকার যে সম্পর্ক উঠে এসেছে, তা অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। প্রতিটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করা গেলে হাম নিয়ন্ত্রণে বড় অগ্রগতি সম্ভব। আর সেই লক্ষ্য পূরণে জরুরি উদ্যোগের পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।