প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
‘আমি কখনো ভাবিনি যে রাষ্ট্রপতি হব। এটা দলের এবং মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি। রাষ্ট্রপতি হলেও আমার ইচ্ছে আছে, আমি জনগণের পাশে থেকে সেবা করব।’—বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই বক্তব্যে উঠে এসেছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ধরে রাখার প্রত্যয়।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর হেয়ার রোডে নিজের সরকারি বাসভবনে ঠাকুরগাঁও সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব ও ব্যস্ততা যতই বাড়ুক, জনগণের জন্য এবং নিজ এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে তিনি সবসময় পাশে থাকার চেষ্টা করবেন।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। বিএনপি তাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। নির্বাচন কমিশন তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে বিরোধী জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের প্রার্থিতাও বৈধ হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণের কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি যে তাঁর জন্য আবেগঘন, সাক্ষাৎকালে মির্জা ফখরুলের কথাবার্তায় তারও প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, কখনো রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা ভাবেননি। দলীয় মনোনয়ন পাওয়াকে তিনি দলের আস্থা এবং মহান আল্লাহর বিশেষ মেহেরবানি হিসেবে উল্লেখ করেন। নিজের রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলার প্রেক্ষাপটে এমন একটি দায়িত্বের জন্য মনোনীত হওয়াকে তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন বলেও তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়।
ঠাকুরগাঁও সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার নেতারা এ সময় তাকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিনন্দন জানান। সৌজন্য সাক্ষাতের পরিবেশে মির্জা ফখরুল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বলে জানা গেছে। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও মতবিনিময় করেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পরও নিজের এলাকার মানুষের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। তিনি বলেছেন, যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, জনগণের জন্য এবং এলাকার উন্নয়নে পাশে থাকবেন। এতে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজ এলাকার মানুষের প্রতি সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে আসে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর প্রার্থিতা সামনে আসার পর ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও তাকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাতে এলাকার উন্নয়নের প্রসঙ্গ তোলা সেই স্থানীয় যোগাযোগের ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত দেয়।
তবে রাষ্ট্রপতি পদটি একজন রাজনৈতিক নেতার সাধারণ রাজনৈতিক দায়িত্বের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ও ক্ষমতার নির্দিষ্ট সাংবিধানিক কাঠামো রয়েছে। ফলে মির্জা ফখরুলের ‘জনগণের পাশে থেকে সেবা’ করার প্রত্যয়কে রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। দীর্ঘ সময় পর এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনের দিকে রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ রয়েছে। মির্জা ফখরুলের মতো দীর্ঘদিনের একজন রাজনীতিক এই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও আলোচনা চলছে।
বিএনপি ১৩ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদও ছাড়েন। পরবর্তীতে তাঁর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের যাচাই-বাছাই শেষে তাঁর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা বৈধ হওয়ার পাশাপাশি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের প্রার্থিতাও বহাল রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। জাতীয় সংসদের সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। নির্ধারিত সময়ে সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নির্বাচনের প্রাক্কালে মির্জা ফখরুলের ‘জনগণের পাশে থাকার’ বক্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরেও একটি ব্যক্তিগত প্রত্যয়ের প্রকাশ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরিচিত মানুষ, নিজ এলাকার নাগরিক এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর যে যোগাযোগ, রাষ্ট্রপতি হলেও সেই সম্পর্ককে তিনি ধরে রাখতে চান—সাক্ষাৎকারে তাঁর কথায় সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার সৌজন্য সাক্ষাতে সংগঠনের সভাপতি বাংলাদেশ প্রতিদিনের মানিক মুনতাসির, সাধারণ সম্পাদক সমকালের দেলোয়ার হোসেন, বাসসের প্রধান বার্তা সম্পাদক মানিকুল আজাদ, সহসভাপতি স্টার টিভির মাহবুব আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কালবেলার শফিকুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক বাসসের জাহাঙ্গীর আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক ৭১ টেলিভিশনের আব্দুল লতিফ, প্রচার সম্পাদক জিটিভির সাজ্জাদ হোসেন এবং নারীবিষয়ক সম্পাদক নিউজ টুয়েন্টি ফোরের মোছা. শিউলী বেগম নাহিদ উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সংগঠনের কার্যনির্বাহী সদস্য ৭১ টেলিভিশনের নূর তাজমিন নীর, স্টার টিভির ফরহাদ বিন নূর, কালের কণ্ঠের মো. নবাব শরীয়তুল্লাহ (সৌম্য সরকার), সাম্প্রতিক দেশকালের নাসরিন আখতার, যুগান্তরের ইমরান খান, চ্যানেল আইয়ের তাফহিমুল ইসলাম এবং নিউজ এজেন্সি এবিপির বিশেষ প্রতিনিধি আবু সাঈদ উপস্থিত ছিলেন।
সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক মশিউর রহমান, প্রথম আলোর তুহিন সাইফুল্লাহ এবং বাসসের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মাহাবুর আলম সোহাগ।
সাক্ষাৎকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের আচরণেও ছিল আন্তরিকতার আবহ। তিনি উপস্থিত প্রত্যেকের খোঁজখবর নেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেন। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্তেও পরিচিতজনদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বজায় রাখার এই দৃশ্য তাঁর বক্তব্যের মানবিক দিকটিকেও সামনে নিয়ে আসে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য ইতোমধ্যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে সামনে এনেছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেও তিনি যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তাঁর কথায় সেই বার্তাই স্পষ্ট। আর ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের জন্য তাঁর ‘এলাকার উন্নয়নে পাশে থাকার’ প্রতিশ্রুতি স্থানীয় পর্যায়েও নতুন প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে হেয়ার রোডের সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত এই সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল একদিকে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীকে অভিনন্দন জানানোর আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, নিজ এলাকার মানুষের প্রতি টান এবং ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক দায়িত্ব নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত প্রত্যয়ের একটি আন্তরিক প্রকাশ। রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থাকার যে ইচ্ছার কথা তিনি জানিয়েছেন, তা বাস্তবে কীভাবে রূপ নেয়—সেদিকেই এখন তাকিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষ।