সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির স্বামী তৌফিক নেওয়াজ আর নেই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির স্বামী তৌফিক নেওয়াজ আর নেই

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেত্রী ডা. দীপু মনির স্বামী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. তৌফিক নেওয়াজ আর নেই। মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দীপু মনির বড় ভাই জে আর ওয়াদুদ টিপু। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তৌফিক নেওয়াজ। তাঁর জানাজা ও দাফনের বিষয়ে বুধবার দুপুরের পর পরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের আবহ নেমে এসেছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যুতে একদিকে যেমন পরিবারের সদস্যরা একজন প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন, অন্যদিকে আইন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন হারিয়েছে পরিচিত একজন ব্যক্তিত্বকে।

তৌফিক নেওয়াজ পেশায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। আইন পেশায় দীর্ঘদিন কাজ করার পাশাপাশি তিনি ধ্রুপদি সংগীতের চর্চার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও অনুরাগ তাঁকে অন্যদের কাছেও আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল।

২০১৯ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ওই সময় তাঁকে দীর্ঘদিন দেশে ও বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। অসুস্থতার কারণে পরবর্তী সময়ে তাঁর চলাফেরাও সীমিত হয়ে পড়ে। সর্বশেষ সময়ে তিনি হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতেন এবং নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে ছিলেন।

চলতি বছরের এপ্রিলেও অসুস্থ অবস্থায় তৌফিক নেওয়াজকে হুইলচেয়ারে করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তিনি তাঁর স্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অনুমতি নিয়ে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি। সেই সাক্ষাতের দৃশ্য তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যেও স্ত্রীকে দেখতে তাঁর ওই উপস্থিতি ছিল আবেগঘন একটি মুহূর্ত। শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় হুইলচেয়ারে করে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে দীপু মনির সঙ্গে দেখা করার ঘটনাটি তাঁদের পারিবারিক জীবনের কঠিন সময়ের একটি মানবিক চিত্র সামনে এনেছিল।

তৌফিক নেওয়াজের অসুস্থতার ইতিহাস অবশ্য আরও পুরোনো। ২০১৯ সালে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসা নিয়ে তখন দেশজুড়ে আলোচনা হয়েছিল। সে সময় তাঁকে ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের মুম্বাইয়ে নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া করেছিলেন।

তাঁর অসুস্থতার সময়ে চিকিৎসার জন্য পরিবারের পাশে থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছিল। ২০১৯ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তৌফিক নেওয়াজকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং চিকিৎসকদের কাছে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছিলেন।

আইনজীবী হিসেবে তৌফিক নেওয়াজের দীর্ঘ পেশাগত জীবন ছিল। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আইনজীবী হিসেবে অংশ নিয়েছেন। আদালতে সাংবিধানিক ও আইনগত বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে তিনি আইন অঙ্গনে পরিচিত মুখ ছিলেন।

আইন পেশার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক উদ্যোগের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে আইন পেশার বাইরে নাগরিক সমাজেও তাঁর পরিচিতি ছিল।

তবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে আলোচিত পরিচয় ছিল ডা. দীপু মনির জীবনসঙ্গী হিসেবে। দীপু মনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সরকারি দায়িত্ব পালনের ব্যস্ত সময়েও তৌফিক নেওয়াজ ছিলেন পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য।

দীর্ঘ অসুস্থতার সময়ে তৌফিক নেওয়াজের শারীরিক অবস্থার কারণে পরিবারের ওপরও নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসা, হাসপাতাল, পুনর্বাসন এবং নিয়মিত পরিচর্যার মধ্য দিয়ে তাঁকে সময় কাটাতে হয়েছে। অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন সীমিত হয়ে গেলেও পরিবার তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করেছে।

২০১৯ সালের স্ট্রোকের পর তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসাজীবন মূলত শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন সময় তাঁর চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে তথ্য জানানো হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অসুস্থতা শেষ পর্যন্ত তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেয়নি।

২০২৬ সালের এপ্রিলের ঘটনাটি তাঁর শেষ সময়ের পারিবারিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে থাকল। তখন শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও স্ত্রীকে দেখতে তিনি ট্রাইব্যুনালে গিয়েছিলেন। হুইলচেয়ারে বসা তৌফিক নেওয়াজকে পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সাক্ষাৎ ছিল তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের কঠিন সময়ের একটি স্পর্শকাতর অধ্যায়।

এর কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হলো। দীর্ঘদিন হাসপাতাল ও চিকিৎসার মধ্যে থাকার পর মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আইনজীবী, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, রাজনৈতিক মহল ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার দুপুরের পর তৌফিক নেওয়াজের জানাজা ও দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁর মরদেহ কোথায় নেওয়া হবে এবং কখন জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

তৌফিক নেওয়াজের জীবন ছিল একাধিক পরিচয়ের সমন্বয়। তিনি ছিলেন আইনজীবী, নাগরিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি, ধ্রুপদি সংগীতের অনুরাগী এবং একই সঙ্গে একজন দীর্ঘদিনের অসুস্থ মানুষ, যিনি জীবনের শেষ কয়েক বছর শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘ চিকিৎসাযাত্রারও অবসান হলো।

একজন মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি ঘটে না; পরিবারের কাছে তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, শূন্যতা ও বিচ্ছেদের নতুন বাস্তবতা। তৌফিক নেওয়াজের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর চলে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের জন্য সেই গভীর শোকের মুহূর্ত তৈরি করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ স্বজনের পাশে থাকার পর তাঁর মৃত্যু স্বজনদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

আইন অঙ্গনে তাঁর পেশাগত অবদান, সংগীতের প্রতি অনুরাগ এবং দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের স্মৃতি তাঁর পরিচিতজনদের মনে থেকে যাবে। একই সঙ্গে হুইলচেয়ারে করে স্ত্রীকে দেখতে ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার সেই দৃশ্যও তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের একটি মানবিক স্মৃতি হয়ে থাকবে।

তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুতে শোকাহত পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তাঁর পরিচিতজনেরা। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত