মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপিতে মুকুল, বদল নিয়ে প্রশ্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপিতে মুকুল, বদল নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকার পর দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন আসাদুল ইসলাম মুকুল। বুধবারের আগের রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টের মাধ্যমে বিএনপিতে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি। এর পর থেকেই তার রাজনৈতিক অবস্থান, দলবদলের কারণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে ধামরাই ও সাভারের স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মুকুলের রাজনৈতিক গতিপথে সাম্প্রতিক এই পরিবর্তন বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে কারণ, কিছুদিন আগেও তিনি এনসিপির হয়ে ঢাকা-২০ আসনে নির্বাচন করার প্রত্যাশা নিয়ে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। গত বছরের নভেম্বরে তিনি ঢাকা-২০ আসনের জন্য এনসিপির মনোনয়ন ফরমও সংগ্রহ করেছিলেন। সে সময় দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে তার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এরপর এনসিপি ঢাকা-২০ আসনে ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদকে প্রার্থী ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দলটির পক্ষ থেকে নাবিলা তাসনিদের নাম ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ধামরাইয়ে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিও পরিচালনা করেন।

ফলে মুকুলের এনসিপি থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিতে শুধু একটি দলবদল হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এর সঙ্গে নির্বাচনী রাজনীতি, মনোনয়ন প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষ করে যে আসনে তিনি এনসিপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন, সেই আসনে প্রার্থী হতে না পারার পর অন্য একটি বড় রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ায় তার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলবদলের ঘটনা রাজনীতিতে নতুন নয়। নির্বাচনের সময় প্রার্থী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক নেতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে থাকে। তবে কোনো নেতার দল পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হলে তার বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। মুকুলের ক্ষেত্রেও তার দলবদলকে কেবল মনোনয়ন না পাওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার আগে তার নিজের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

মুকুলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আগের তথ্যেও দেখা যায়, তিনি ধামরাইয়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয় ছিলেন। চলতি বছরের জুনে ধামরাইয়ে জুলাই আন্দোলনে শহীদ সাদ হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন।  এর আগে মার্চেও ধামরাইয়ের মানুষের সেবা, যুবসমাজের প্রত্যাশা এবং এলাকার উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।

এই ধারাবাহিকতার কারণে তার বর্তমান দলবদল স্থানীয় রাজনীতিতে আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, একজন রাজনৈতিক কর্মী যখন একটি দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার পর অন্য দলে যোগ দেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার আগের রাজনৈতিক অবস্থান ও নতুন অবস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য খোঁজার চেষ্টা করেন ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীরা। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, সাংগঠনিক পরিবেশ, রাজনৈতিক সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মতো একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে।

মুকুলের বিএনপিতে যোগদানের বিষয়ে এনসিপির ঢাকা জেলা উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল খান বলেন, এটি মুকুলের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুকুলের দলত্যাগে এনসিপির সাংগঠনিক শক্তিতে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। তিনি মনে করেন, মুকুলের দলের প্রতি এমন উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল না যে তার চলে যাওয়ায় সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে বিএনপিতে যোগদানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আসাদুল ইসলাম মুকুল বলেন, এনসিপি ছাড়ার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ নেই। বিএনপির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় তিনি দলটিতে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতে কোনো সাংগঠনিক পদ পেয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আগে কাজ করবেন, এরপর দল তার কাজের মূল্যায়ন করবে।

নিজের রাজনৈতিক এলাকার প্রসঙ্গেও তিনি ধামরাইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। দল সুযোগ দিলে ধামরাইয়ের মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। একই সঙ্গে এনসিপির নেতাদের জন্য শুভকামনাও জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, দল পরিবর্তন করলেও স্থানীয় পর্যায়ে ধামরাইকে ঘিরে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ রয়েছে।

তবে তার দলবদলের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, তিনি ভবিষ্যতে কোন রাজনৈতিক ভূমিকায় থাকবেন। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি কোনো সাংগঠনিক পদ পাবেন কি না, নির্বাচনী রাজনীতিতে তাকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে এবং ধামরাইয়ের রাজনীতিতে তার অবস্থান কী হবে—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। মুকুল নিজেই জানিয়েছেন, আগে তিনি দলের জন্য কাজ করতে চান এবং পরে দল তার কাজের মূল্যায়ন করবে।

রাজনৈতিক বাস্তবতায় মনোনয়ন না পাওয়া কোনো দলের নেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুহূর্ত তৈরি করতে পারে। কেউ দলের সিদ্ধান্ত মেনে থেকে সংগঠনের ভেতরে কাজ চালিয়ে যান, কেউ আবার রাজনীতিতে নতুন পথ বেছে নেন। মুকুলের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়ার ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে তার এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের কৌশল হিসেবে দেখার পাশাপাশি তার নিজের দেওয়া ব্যাখ্যাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

ঢাকা-২০ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নাবিলা তাসনিদের নাম ঘোষণার পরও স্থানীয় পর্যায়ে দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের খবর সামনে এসেছিল। ডিসেম্বরের শেষ দিকে স্থানীয় কয়েকজন নেতা নাবিলা তাসনিদকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার কথা জানিয়েছিলেন। পরে জানুয়ারিতে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে স্থানীয় নেতৃত্ব আবার তাকে সমর্থনের ঘোষণা দেয়।  এই প্রেক্ষাপটে মুকুলের দলত্যাগ ধামরাইয়ের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন আলোচনার মাত্রা যোগ করেছে।

তবে রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের ঘটনাকে ঘিরে আলোচনা যতই হোক, শেষ পর্যন্ত একজন রাজনীতিকের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয় তার কর্মকাণ্ড, জনসম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং মানুষের কাছে তার দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। মুকুলের ক্ষেত্রেও আগামী দিনে তার কর্মকাণ্ডই বলে দেবে বিএনপিতে তার নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় কতটা কার্যকর ও স্থায়ী হয়।

এখন নজর থাকবে ধামরাই ও সাভারের রাজনৈতিক অঙ্গনে মুকুলের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তিনি নতুন দলে কী ধরনের দায়িত্ব পান, কীভাবে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ কোন পর্যায়ে যায়—এসব প্রশ্নের উত্তরই তার দলবদলের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করবে। আপাতত এনসিপির মনোনয়ন প্রত্যাশী থেকে বিএনপির নতুন কর্মী হিসেবে তার এই যাত্রা স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত