কিমের সঙ্গে এ বছরই বৈঠক চান ট্রাম্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
কিমের সঙ্গে এ বছরই বৈঠক চান ট্রাম্প

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে চলতি বছরের শরতেই বৈঠক করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ লক্ষ্যে ট্রাম্প তাঁর উপদেষ্টাদের প্রস্তুতি নিতে বলছেন বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভাব্য বৈঠকটি আগামী নভেম্বর চীনের শেনঝেনে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন বা এপেক সম্মেলনকে ঘিরে হতে পারে বলে জানা গেছে।

তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বা উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে এমন বৈঠকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে ট্রাম্প ও কিমের সম্ভাব্য সাক্ষাৎ শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে দুই দেশের কূটনৈতিক প্রস্তুতি, উত্তর কোরিয়ার অবস্থান এবং বৈঠকের সময় ও স্থান নিয়ে সমঝোতার ওপর।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত কূটনৈতিক উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে কিমের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করে বিশ্ব রাজনীতিতে নজির তৈরি করেছিলেন ট্রাম্প। এবার দ্বিতীয় মেয়াদে সেই ব্যক্তিগত যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে আলোচনার দরজা খোলার চেষ্টা করছেন তিনি।

ট্রাম্প ও কিমের সম্পর্কের শুরু অবশ্য ছিল তীব্র উত্তেজনায়। ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়া একের পর এক পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালে ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ট্রাম্প তখন কিমকে ব্যঙ্গ করে ‘লিটল রকেটম্যান’ নামে অভিহিত করেছিলেন এবং উত্তর কোরিয়াকে কঠোর পরিণতির হুমকি দিয়েছিলেন। পাল্টা জবাবে কিমও ট্রাম্পকে আক্রমণাত্মক ভাষায় সমালোচনা করেন। দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু এক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। দুই নেতার মধ্যে চিঠি আদান-প্রদান শুরু হয় এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ দেখা যায়। ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে এসব চিঠিকে রসিকতার সঙ্গে ‘প্রেমপত্র’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, কিমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০১৮ সালের জুনে সিঙ্গাপুরে দুই নেতার প্রথম ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে কূটনৈতিক সম্ভাবনার নতুন অধ্যায় তৈরি হয়। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হলেও পরবর্তী সময়ে সেই আলোচনার বাস্তব অগ্রগতি সীমিত হয়ে পড়ে।

এরপর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে দ্বিতীয় বৈঠকে বসেন ট্রাম্প ও কিম। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিনিময়ে দেশটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। কোনো চুক্তি ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। তবু ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুই নেতার যোগাযোগ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

একই বছরের জুনে দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চলে আবারও আকস্মিকভাবে সাক্ষাৎ করেন ট্রাম্প ও কিম। ওই সাক্ষাতে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে কয়েক পা এগিয়ে যান। এর মাধ্যমে তিনি দায়িত্বে থাকা প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রাখেন। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে পরবর্তী সময়ে দুই দেশের আলোচনায় আর তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অব্যাহত রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্রও নিষেধাজ্ঞা ও চাপের নীতি বজায় রাখে। জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির সময় ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়নি। একই সময়ে উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার ঘোষণা দেয়।

২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর কিমের সঙ্গে তাঁর পুরোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক আবার আলোচনায় আসে। ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, কিমের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ভালো এবং তিনি মনে করেন উত্তর কোরিয়ার নেতা তাঁকে সম্মান করেন। এই ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে সংলাপের সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা শুরু হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার মাত্রা কমানোর পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, এ ধরনের বড় সামরিক মহড়া উত্তর কোরিয়ার কাছে উসকানিমূলক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং কূটনৈতিক পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা দুই দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে এর কিছু অংশ পুনর্বিবেচনার বিষয়টি ওয়াশিংটনে আলোচিত হচ্ছে।

ট্রাম্প ও কিমের সম্ভাব্য নতুন বৈঠক হলে এর আলোচনায় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের নতুন কাঠামো এবং কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

তবে এবার পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। উত্তর কোরিয়া গত কয়েক বছরে তার পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের নতুন কোনো সমঝোতা হলে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন ও রাশিয়ার নিরাপত্তা হিসাবেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

চীনও সম্ভাব্য এই বৈঠকের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এপেক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা একই সময়ে চীনে উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে সময় ট্রাম্প ও কিমের সাক্ষাৎ হলে তা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে বৈঠকের আগে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মার্কিন কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা এগোয়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প-কিম বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন। উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত বা বন্ধ করার বিষয়টিকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চায়। দুই পক্ষের এই মৌলিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলে নতুন বৈঠকও আগের বৈঠকগুলোর মতো সীমিত ফলাফলে আটকে যেতে পারে।

তবু সম্ভাব্য বৈঠকটির গুরুত্ব কম নয়। কয়েক বছর ধরে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ থেকে দূরে থাকা দুই দেশের মধ্যে আবারও শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনা শুরু হলে সামরিক উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বন্দি, মানবিক সহায়তা, পারিবারিক যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়েও আলোচনার পথ খুলতে পারে।

সবশেষে, ট্রাম্পের আগ্রহ থাকলেও কিম জং উন বৈঠকে বসতে কতটা আগ্রহী—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সম্মতি না আসা পর্যন্ত সম্ভাব্য বৈঠকটি কেবল কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক আগ্রহের পর্যায়েই থাকবে। তবে যদি নভেম্বরের এপেক সম্মেলনকে ঘিরে ট্রাম্প ও কিম আবার মুখোমুখি হন, তাহলে সেটি কোরীয় উপদ্বীপের উত্তেজনা প্রশমন এবং যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত