ভারতীয় কৃষিপণ্যে কেন ‘রেড ফ্ল্যাগ’ জারি হচ্ছে

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানি আন্তর্জাতিক বাজারে একের পর এক নতুন বাধার মুখে পড়ছে। আম, চাল ও মশলার মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যে বিভিন্ন দেশের মাননিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও সনদ নিয়ে আপত্তি উঠছে। জাপান ভারতীয় আমের চালান স্থগিত করেছে, চীন ভারতীয় চালের কয়েকটি চালান ফিরিয়ে দিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতীয় মশলার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে।

এসব ঘটনার পেছনে শুধু পৃথক কোনো চালানের ত্রুটি নয়, বরং কৃষিপণ্যের পরীক্ষাব্যবস্থা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্য উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত ট্রেসেবিলিটির ঘাটতিও সামনে এসেছে।

জাপানে আম রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনৌর রেহমানপুরে অবস্থিত একটি ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) প্ল্যান্টে চলতি বছরের মার্চে জাপানের কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শকরা পরিদর্শনে যান। ভারতের আম রপ্তানির ব্যস্ত মৌসুম শুরুর ঠিক আগে এই পরিদর্শন হয়।

ভারতীয় আম জাপানে পাঠানোর আগে ভিএইচটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারিত নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু পরিদর্শনের সময় জাপানি কর্মকর্তারা প্রক্রিয়া ও মান নিয়ন্ত্রণে গুরুতর অনিয়মের প্রশ্ন তোলেন।

এরপর ৩১ মার্চ ইয়োকোহামার প্ল্যান্ট প্রটেকশন অথরিটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে জানায়, ২৫ মার্চ বা তার পর ইস্যু করা সনদযুক্ত ভারতীয় আমের চালান আপাতত জাপানে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। পরিদর্শকরা প্রক্রিয়ার মান উন্নত হয়েছে বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে।

ভারত ও জাপানের মধ্যে আম বাণিজ্যের ইতিহাস প্রায় দুই দশকের। এর আগে ১৯৮৬ সালে ফলখেকো ক্ষতিকর পোকার আশঙ্কায় ভারতীয় আমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল জাপান। দীর্ঘ ২০ বছর পর ২০০৬ সালে ভিএইচটি সুবিধা, পোকা নিয়ন্ত্রণের নজরদারি এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা চালুর পর সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

বর্তমানে জাপানে রপ্তানির জন্য অনুমোদিত ছয় জাতের আম—আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বেগুনফুলি, চৌসা ও মল্লিকা—এই সিদ্ধান্তের প্রভাবে ঝুঁকিতে পড়েছে।

পরিমাণে ছোট হলেও জাপানের বাজার গুরুত্বপূর্ণ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপান ভারত থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার মূল্যের তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আম আমদানি করেছে। পরিমাণের বিচারে এটি ভারতের মোট কৃষি রপ্তানির তুলনায় খুব বড় বাজার নয়। তবে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের কাছে জাপানের বাজারের গুরুত্ব অন্য জায়গায়।

জাপানি বাজারে প্রবেশের জন্য কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। ফলে সেখানে পণ্য বিক্রি করতে পারা আন্তর্জাতিক বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানস্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

একজন ভারতীয় আম রপ্তানিকারকের মতে, জাপানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে বছরের পর বছর সময় লাগে। তাই একটি মৌসুমে মান নিয়ন্ত্রণের সমস্যা দেখা দিলে শুধু ওই বছরের রপ্তানি নয়, দীর্ঘদিনে তৈরি করা ক্রেতার আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের আম উৎপাদন খাতের অন্য সংকটও। তাপপ্রবাহের কারণে মহারাষ্ট্রসহ কয়েকটি অঞ্চলে আলফানসো আমের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় সমুদ্র ও আকাশপথে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

চীনে ভারতীয় চাল নিয়ে জিএমও বিতর্ক

আমের পর ভারতীয় চালও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

চীনের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কয়েকটি ভারতীয় চালের চালানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও) থাকার অভিযোগ এনে সেগুলো ফেরত পাঠায়। এরপর গত ১৭ এপ্রিল তিন ভারতীয় চাল রপ্তানিকারকের লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

ভারতীয় রপ্তানিকারকরা অবশ্য এই অভিযোগের প্রতিবাদ করেছেন। তাদের দাবি, চালগুলো জাহাজে তোলার আগেই জিএমও-মুক্ত সনদ পেয়েছিল। ভারত সরকারের বক্তব্যও হলো, দেশের প্রচলিত ধান বা চালের কোনো জাত জিনগতভাবে পরিবর্তিত নয়।

চালের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারতের মোট কৃষিপণ্য রপ্তানির ২০ শতাংশের বেশি আসে চাল থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত রেকর্ড প্রায় ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চাল রপ্তানি করেছে।

চীনের বাজারে সৃষ্ট জটিলতা তাই শুধু তিনটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি ভারতের পুরো চাল রপ্তানি খাতের জন্য সতর্কবার্তা তৈরি করেছে।

পরীক্ষাগারের সক্ষমতার ঘাটতিও সামনে

ভারতের কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, চীনের জিএমও পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেশটির পরীক্ষাগার ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।

ভারতের অনেক ল্যাব কীটনাশক ও অ্যাফলাটক্সিন পরীক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিলেও জিএমও শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সক্ষমতা সব জায়গায় নেই। ফলে সরকারি অনুমোদিত ল্যাব থেকে সনদ নেওয়ার পরও বিদেশি বন্দরে পণ্য আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকছে।

এ সমস্যার আরেকটি দিক হলো ভৌগোলিক অসমতা। চালের নির্দিষ্ট ধরনের পরীক্ষার সুবিধা মূলত দিল্লি ও তেলেঙ্গানার হায়দ্রাবাদের মতো কয়েকটি কেন্দ্রে বেশি রয়েছে। ফলে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোর রপ্তানিকারকদের নমুনা পরীক্ষা করাতে অনেক দূরে পাঠাতে হয়।

এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে। পাশাপাশি উৎপাদন, নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার সুযোগও থাকে।

মশলাতেও আন্তর্জাতিক সতর্কতা

আম ও চালের সংকটের আগেই ভারতীয় কৃষিপণ্যের মান নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সতর্কবার্তা দেখা দিয়েছিল।

কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়ার পর হংকং ভারতের কয়েকটি মশলাজাতীয় পণ্যের বিক্রি বন্ধ করে দেয়। বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রায় ১২ শতাংশ নমুনায় মানের ঘাটতি ধরা পড়ে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘র‌্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেমে’ ভারতীয় মশলা নিয়ে ৩১২টি সতর্কবার্তা জারি করা হয়। এর পর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ভারতীয় জিরার ওপর পরীক্ষার হার বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়।

এই ধরনের ঘটনা ভারতীয় কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়াচ্ছে।

মূল সমস্যা সরবরাহ ব্যবস্থায়

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হলো সরবরাহ ব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতা।

একজন কৃষক সাধারণত তার ফসল মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে বিক্রি করেন। সেখান থেকে তা যায় ব্যবসায়ীর কাছে, এরপর প্রক্রিয়াজাতকারী বা রপ্তানিকারকের কাছে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ হাতবদলের মধ্যে কখন কোন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে ফসল সংরক্ষণ করা হয়েছে বা কোন পর্যায়ে পণ্যের মান পরিবর্তিত হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য অনেক সময় সংরক্ষিত থাকে না।

ফলে কোনো পণ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের নির্ধারিত সীমার বেশি রাসায়নিক বা অন্য কোনো উপাদান পাওয়া গেলে তার উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের সমস্যার সমাধানে উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার এবং একীভূত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাচ্ছে

ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো ইতোমধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

থাইল্যান্ড দেশজুড়ে খাদ্যপণ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভিয়েতনাম কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করছে। ব্রাজিল ও চিলি আধুনিক কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে।

এসব উদ্যোগের ফলে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পণ্যের মান ও উৎস সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ করা সহজ হচ্ছে।

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশ হলেও আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে দেশটির অংশ মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সঙ্গে মোট কৃষিপণ্য রপ্তানির মধ্যে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের অংশ প্রায় ১৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ এবং চীনে প্রায় ৫০ শতাংশ।

অর্থাৎ, বিপুল কৃষি উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও ভারত এখনো সেই উৎপাদনকে উচ্চমূল্যের, প্রক্রিয়াজাত ও মাননির্ভর রপ্তানি পণ্যে পর্যাপ্তভাবে রূপান্তর করতে পারেনি।

কৃষকরাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত

আন্তর্জাতিক বাজারে একটি চালান আটকে গেলে ক্ষতি শুধু রপ্তানিকারকের হয় না। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত কৃষকের কাছেও পৌঁছে যায়।

রপ্তানি বন্ধ হলে অতিরিক্ত পণ্য স্থানীয় বাজারে চলে আসতে পারে। এতে দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে রপ্তানির জন্য নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী উৎপাদন করা কৃষকরা হঠাৎ বাজার হারালে তাদের বিনিয়োগ ও আয় উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ভারতের আমচাষিরা যেমন জাপানের মতো উচ্চমূল্যের বাজারকে লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট জাত ও মানের আম উৎপাদন করেন, তেমনি চাল ও মশলা উৎপাদনকারীরাও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।

তাই সাম্প্রতিক ‘রেড ফ্ল্যাগ’গুলোকে শুধু কয়েকটি রপ্তানি চালানের সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় চিত্রটি আড়ালে থেকে যাবে। এগুলো ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানি ব্যবস্থার মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রয়োজনীয়তার একটি বড় সতর্কসংকেত।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত