বকেয়া বেতনের দাবিতে চট্টগ্রামে শ্রমিকদের অবরোধ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
বকেয়া বেতনের দাবিতে চট্টগ্রামে শ্রমিকদের অবরোধ

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় বকেয়া বেতন ও ভাতা পরিশোধের দাবিতে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুরাদপুর–অক্সিজেন সড়কের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশে শ্রমিকেরা অবস্থান নেওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে নগরীর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রমিকেরা প্রথমে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে দাবি আদায়ে কোনো সমাধান না হওয়ায় তাঁরা সড়কে নেমে আসেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁরা আতুরার ডিপো এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে মুরাদপুর–অক্সিজেন সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয় এবং শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে অবরোধ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আতুরার ডিপো এলাকার ওই পোশাক কারখানাটিতে কিছুদিন আগে মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। মালিকানা পরিবর্তনের পর থেকেই শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা নিয়ে নতুন মালিকপক্ষের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাঁদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও পুরো বিষয়টির সমাধান হয়নি।

বেতন না পাওয়ার বিষয়টি শ্রমিকদের জন্য শুধু কর্মক্ষেত্রের একটি বিরোধ নয়, বরং তাঁদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভর করেই এসব শ্রমিকের পরিবার চলে। ফলে কয়েক দিনের বেতন আটকে যাওয়া কিংবা দীর্ঘদিনের পাওনা অনিশ্চিত হয়ে পড়া তাঁদের সংসারে সরাসরি চাপ তৈরি করে। এ কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁরা কর্মস্থল ছেড়ে সড়কে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের বিরোধের আরেকটি বিষয় হলো আগে পালন করা চার দিনের কর্মবিরতির বেতন-ভাতা। বেতন ও পাওনা পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকেরা এর আগে চার দিন কর্মবিরতি পালন করেছিলেন। সেই চার দিনের বেতন তাঁরা পাবেন কি না, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। শ্রমিকেরা ওই সময়ের বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবি জানালেও মালিকপক্ষ তা দিতে অনিচ্ছুক ছিল বলে জানা গেছে।

এই বিরোধের জেরেই বুধবার শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে। প্রথমে কর্মবিরতি এবং পরে সড়ক অবরোধের মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের দাবি তুলে ধরেন। তাঁদের মূল দাবি, বকেয়া বেতন ও প্রাপ্য ভাতা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে এবং শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

শিল্প পুলিশ চট্টগ্রামের সুপার মাহমুদা বেগম জানান, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শ্রমিকেরা কর্মবিরতি পালন করেন। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁরা সড়ক অবরোধ শুরু করেন। খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছিল। এর মধ্যেই কারখানাটির মালিকানা পরিবর্তন হয়। সর্বশেষ চার দিনের বেতন-ভাতার বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করেন।

সড়ক অবরোধের কারণে মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন হয়ে হাটহাজারীমুখী সড়কে যান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এই সড়কটি চট্টগ্রাম নগরীর সঙ্গে হাটহাজারীসহ উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। পাশাপাশি খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিসহ পার্বত্য এলাকার অনেক মানুষও এই সড়ক ব্যবহার করেন। ফলে অবরোধের প্রভাব শুধু স্থানীয় যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

অবরোধের পর অনেক যানবাহনকে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে দেখা যায়। এতে যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও আকস্মিক যানজটে আটকা পড়েন। সড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনের চাপ তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের দাবি ও মালিকপক্ষের অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে অবনতি না হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি অবরুদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও পুলিশ সতর্ক রয়েছে।

শিল্প পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম আরও জানান, মুরাদপুর–হাটহাজারী সড়কের যাত্রী ও যানবাহনগুলোকে বিকল্প পথ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আতুরার ডিপো ও আশপাশের এলাকায় আরও কয়েকটি পোশাক কারখানা রয়েছে। ফলে একটি কারখানার শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে আশপাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক যোগাযোগেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

চট্টগ্রামের পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে বিরোধ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে একটি কারখানার মালিকানা পরিবর্তনের পর পুরোনো ও নতুন মালিকপক্ষের দায়-দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ জটিল হয়ে উঠতে পারে। শ্রমিকেরা সাধারণত চান, মালিকানা পরিবর্তন হলেও তাঁদের পূর্বের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত পাওনা যেন কোনোভাবেই অনিশ্চিত না হয়।

আতুরার ডিপোর এই ঘটনাতেও সেই উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা কাজ করেছেন এবং সেই কাজের বিনিময়ে নির্ধারিত বেতন ও ভাতা পাওয়ার অধিকার রাখেন। তাই আশ্বাসের পরিবর্তে তাঁরা এখন বাস্তব সমাধান চান। অন্যদিকে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হলে সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শ্রমিকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতি সহজেই স্বাভাবিক করা সম্ভব। কারণ শ্রমিকদের জন্য বকেয়া বেতন শুধু একটি আর্থিক দাবি নয়; এর সঙ্গে তাঁদের পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের নিরাপত্তা জড়িয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এদিকে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবরোধের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার বিষয়টি দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক রাখাও জরুরি হয়ে পড়েছে। আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে একদিকে শ্রমিকদের পাওনা আদায়ের পথ খুলবে, অন্যদিকে ব্যস্ত সড়কটিও দ্রুত স্বাভাবিক হবে।

বুধবার দুপুর পর্যন্ত ঘটনাস্থলে শিল্প পুলিশ ও থানা-পুলিশ অবস্থান করে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। শ্রমিকদের বুঝিয়ে কাজে ফেরানো এবং সড়ক থেকে তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে কত দ্রুত সমস্যাটির সমাধান হয়, সেটিই এখন সবার নজরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত