এআই প্রতিযোগিতায় ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব চায় চীন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩০ বার
এআই প্রতিযোগিতায় ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব চায় চীন

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য দেশগুলোকে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। একই সঙ্গে প্রতিটি দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’কে সম্মান করার ওপর জোর দিয়েছে চীন।

বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দেশটির মুখপাত্র লিন জিয়ান এ অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তি ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে আলাদা শিবিরে ভাগ করা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া উচিত নয়। প্রতিটি দেশের নিজেদের জাতীয় বাস্তবতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তিগত অংশীদার বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা দরকার।

চীনের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন এআই প্রযুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রতিযোগিতা কেবল গবেষণা ও উদ্ভাবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উন্নত এআই মডেল, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড অবকাঠামো, সফটওয়্যার এবং প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঘিরেও দুই দেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। ফলে এআই এখন প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।

লিন জিয়ান বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব জাতীয় পরিস্থিতি ও উন্নয়নের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতার অংশীদার বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। চীনের দৃষ্টিতে এআই প্রযুক্তির বিকাশ এমন কোনো কাঠামোর দিকে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে দেশগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।

বেইজিংয়ের বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’। এর অর্থ হলো একটি দেশ তার নিজস্ব প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্য, ডেটা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল নীতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখবে। চীনের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সময়ে এই স্বাধীনতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি এআই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সম্ভাব্য একটি আন্তর্জাতিক জোট নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। এমন একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোকে চীনের প্রযুক্তিগত পরিসরের বাইরে রাখার চেষ্টা করা হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বেইজিং। চীনের বক্তব্যে সেই সম্ভাব্য বিভাজনের বিরোধিতাই স্পষ্ট হয়েছে।

এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্বের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উন্নত এআই মডেল, চিপ ও অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে চীনও নিজস্ব এআই মডেল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, চিপ প্রযুক্তি এবং দেশীয় প্রযুক্তি অবকাঠামোকে দ্রুত শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো উন্নত সেমিকন্ডাক্টর। আধুনিক এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন। সেই ক্ষমতার বড় অংশ নির্ভর করে উন্নত চিপের ওপর। ফলে উন্নত চিপের উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও বাণিজ্যনীতির বিভিন্ন পদক্ষেপ চীনের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাকে সীমিত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে উন্নত কম্পিউটিং চিপ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি চীনে পৌঁছানো নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। এর বিপরীতে চীন নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে।

এ অবস্থায় তৃতীয় দেশগুলোর সামনে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুবিধা নিতে চায়, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাও ধরে রাখতে চায়। ফলে এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ তাদের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি করতে পারে।

চীনের সর্বশেষ বক্তব্যে তাই শুধু ওয়াশিংটনের সমালোচনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বেইজিং এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যেখানে দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও অংশীদার নির্বাচন করতে পারবে এবং কোনো বড় শক্তির নেতৃত্বাধীন প্রযুক্তি জোটে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত হতে হবে না।

এআই নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তির ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ ও সরকারি সেবায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। একই সঙ্গে এর অপব্যবহার, তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, ভুয়া তথ্য এবং সামরিক প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। ফলে এআই প্রযুক্তির মালিকানা ও ব্যবহারের প্রশ্ন এখন রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়ে আসছে। দেশটির নীতিনির্ধারকদের কাছে নিজস্ব চিপ, সফটওয়্যার, এআই মডেল এবং ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় নয়; জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান বক্তব্যে ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’-এর ওপর জোর দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে উন্নত এআই প্রযুক্তির বিস্তার জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বিশেষ করে চীনের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে প্রযুক্তি সরবরাহ, চিপ এবং এআই অবকাঠামো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে নিরাপত্তার বিষয়টি ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর জন্য এই প্রতিযোগিতার প্রভাব বহুমাত্রিক হতে পারে। প্রযুক্তি নির্বাচন থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, ডেটা ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের সামনে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা একদিকে উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা নিতে চায়, অন্যদিকে অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও এড়াতে চায়।

চীনের বক্তব্যে তাই একটি বিষয় স্পষ্ট—বেইজিং এআইকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শক্তির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে এবং এই ক্ষেত্রে কোনো একক শক্তির আধিপত্যের বিরোধিতা করছে। একই সঙ্গে দেশগুলোকে নিজেদের প্রযুক্তিগত পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

এআই প্রতিযোগিতা আগামী দিনে কতটা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের লড়াই থাকবে আর কতটা ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা যত গভীর হবে, ততই বিশ্বের অন্যান্য দেশকে নিজেদের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। আর সেই বাস্তবতায় ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com