আমদানি বাড়লেও বিনিয়োগে গতি নেই: ক্যাপিটাল মেশিনারি

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আমদানি বাড়লেও দেশে নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি বাড়ছে না। ফলে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও বেসরকারি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাকে সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। একই সময়ে সামগ্রিক আমদানিও আগের তুলনায় বেড়েছে। অর্থনীতির জন্য এসবকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও আমদানির কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়ে গেছে—উৎপাদন ও নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে প্রত্যাশিত গতি নেই।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি সাধারণত বেসরকারি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো বা প্রযুক্তি আধুনিকায়নের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানি করলে তা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আমদানি বাড়ার পরও যদি মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি স্থবির থাকে, তাহলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের চাহিদা কতটা শক্তিশালী হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতির হার এখনও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করছে। একই সময়ে বিনিয়োগ পরিস্থিতিও স্থবির হয়ে আছে। ঋণের সুদহার কিছুটা কমানো হলেও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।

অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও চাপ রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন করা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান নেতিবাচক হয়ে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

ম্যানুফ্যাকচারিং খাত পুনরুদ্ধার না হলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে। কারণ শিল্প খাত শুধু জিডিপিতে সরাসরি অবদান রাখে না, একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও গত ছয় মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। নতুন বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগও সীমিত থাকে। ফলে বাজেটে ঘোষিত বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ সৃষ্টি করতে পারবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিতে এক ধরনের অস্পষ্টতা। একদিকে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, ঋণের সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের স্টিমুলাস প্যাকেজ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিও অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

এই দুই ধরনের নীতির সমন্বয় কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করার চেষ্টা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থের প্রবাহ সীমিত রাখার উদ্যোগ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত সহায়তা, সংস্কার এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথাও বলা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও বিনিয়োগ প্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।

সরকার আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি ‘রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক পলিসি’ তৈরির কাজ করছে। এতে বিভিন্ন খাতের জন্য সরকারের করণীয় এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ধারণের কথা রয়েছে। নীতিগতভাবে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে শুধু পরিকল্পনা বা নীতিপত্র তৈরি করলেই বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ব্যবধান রয়েছে। অতীতেও বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সংস্কার কর্মসূচিতে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলো প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি।

এ কারণে নতুন নীতির পাশাপাশি বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা এবং দ্রুত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা না গেলে কেবল সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করা। এর সঙ্গে উৎপাদন খাতকে ঘুরে দাঁড় করানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উন্নতি এবং আমদানি বৃদ্ধির মতো ইতিবাচক সূচকগুলো অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি ও বেসরকারি বিনিয়োগে গতি না ফিরলে এই স্থিতিশীলতা টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেওয়া কঠিন হতে পারে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত